মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৩:৪৫ অপরাহ্ন

ই-পেপার

ইসলামের দৃষ্টিতে ভোটের গুরুত্ব এবং কাকে ভোট দেওয়া উচিত – মুফতি মাওলানা: শামীম আহমেদ

চলনবিলের আলো ডেস্ক:
আপডেট সময়: মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ২:০৫ অপরাহ্ণ

ইসলামে রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং জনমতের গুরুত্ব অপরিসীম। আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ‘ভোট’ দেওয়াকে ইসলামি পণ্ডিতগণ কেবল একটি রাজনৈতিক কাজ হিসেবে দেখেন না, বরং এটি একটি শরয়ি আমানত এবং সাক্ষ্য প্রদান (গাওয়াহি) হিসেবে বিবেচিত।
​কুরআন ও হাদিসের আলোকে ভোটের গুরুত্ব এবং কাকে ভোট দেওয়া উচিত, সে সম্পর্কে নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. ভোট: একটি সাক্ষ্য বা শাহাদাত
​ইসলামি শরিয়তে ভোট দেওয়া মানে হলো সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর ব্যাপারে সত্য সাক্ষ্য প্রদান করা। যদি আপনি জেনে-বুঝে কোনো অযোগ্য বা অসৎ ব্যক্তিকে ভোট দেন, তবে সেটি ‘মিথ্যা সাক্ষ্য’ হিসেবে গণ্য হবে।
​কুরআনের দলিল:
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন:
​وَأَقِيمُوا الشَّهَادَةَ لِلَّهِ
“এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সঠিক সাক্ষ্য দান করো।” (সূরা আত-ত্বলাক, আয়াত: ২)
​অন্য আয়াতে আল্লাহ মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে নিষেধ করেছেন:
​فَاجْتَنِبُوا الرِّجْسَ مِنَ الْأَوْثَانِ وَاجْتَنِبُوا قَوْلَ الزُّورِ
“সুতরাং তোমরা মূর্তিপূজার অপবিত্রতা থেকে বেঁচে থাকো এবং পরিহার করো মিথ্যা বলা (বা মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া)।” (সূরা আল-হজ্জ, আয়াত: ৩০)
​২. আমানত সঠিক ব্যক্তিকে প্রদান
​ভোট বা ক্ষমতা একটি পবিত্র আমানত। এটি কেবল তাকেই দেওয়া উচিত যে এর ভার বহন করতে সক্ষম।
​কুরআনের দলিল:
আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ দিচ্ছেন:
​إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَىٰ أَهْلِهَا
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তোমরা যেন আমানতসমূহ তার হকদারদের নিকট পৌঁছে দাও।” (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৫৮)
​হাদিসের দলিল:
রাসূলুল্লাহ (সা.) অযোগ্য ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়াকে কিয়ামতের আলামত বলেছেন:
​إِذَا وُسِّدَ الأَمْرُ إِلَى غَيْرِ أَهْلِهِ فَانْتَظِرِ السَّاعَةَ
“যখন কোনো দায়িত্ব (পদ বা ক্ষমতা) অযোগ্য ব্যক্তির নিকট অর্পণ করা হয়, তখন তুমি কিয়ামতের অপেক্ষা করো।” (সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ৫৯)
​৩. সুপারিশের দায়িত্ব
​ভোট দেওয়ার অর্থ হলো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জনপ্রতিনিধি হিসেবে সুপারিশ করা। এই সুপারিশের ফলাফল (ভালো বা মন্দ) ভোটারকেও ভোগ করতে হবে।
​কুরআনের দলিল:
​مَّن يَشْفَعْ شَفَاعَةً حَسَنَةً يَكُن لَّهُ نَصِيبٌ مِّنْهَا ۖ وَمَن يَشْفَعْ شَفَاعَةً سَيِّئَةً يَكُن لَّهُ كِفْلٌ مِّنْهَا
“যে ব্যক্তি ভালো কাজের সুপারিশ করবে, তাতে তার অংশ থাকবে। আর যে মন্দ কাজের সুপারিশ করবে, তার (পাপের) বোঝাতেও তার অংশ থাকবে।” (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৮৫)
​৪. প্রার্থীর যোগ্যতা কেমন হওয়া উচিত?
​কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, একজন নেতার বা প্রতিনিধির প্রধান দুটি গুণ থাকা জরুরি: যোগ্যতা (শক্তি/দক্ষতা) এবং সততা (আমানতদারিতা)।
​কুরআনের দলিল:
হযরত ইউসুফ (আ.) নিজের সম্পর্কে বলেছিলেন:
​اجْعَلْنِي عَلَىٰ خَزَائِنِ الْأَرْضِ ۖ إِنِّي حَفِيظٌ عَلِيمٌ
“আপনি আমাকে দেশের ধনভান্ডারের দায়িত্বে নিযুক্ত করুন; নিশ্চয়ই আমি একজন বিশ্বস্ত রক্ষক ও সুবিজ্ঞ (দক্ষ)।” (সূরা ইউসুফ, আয়াত: ৫৫)
​হযরত মুসা (আ.) সম্পর্কে বলা হয়েছিল:
​إِنَّ خَيْرَ مَنِ اسْتَأْجَرْتَ الْقَوِيُّ الْأَمِينُ
“নিশ্চয়ই আপনার কর্মচারী হিসেবে শ্রেষ্ঠ সেই ব্যক্তি, যে শক্তিশালী (দক্ষ) ও আমানতদার।” (সূরা আল-কাসাস, আয়াত: ২৬)
​৫. কাকে ভোট দেবেন? (সংক্ষিপ্ত চেকলিস্ট)
​১. মুত্তাকী ও পরহেজগার: যিনি আল্লাহকে ভয় করেন, তিনি মানুষের ওপর জুলুম করবেন না।
২. দক্ষ ও অভিজ্ঞ: শুধু ভালো মানুষ হলেই হবে না, সংশ্লিষ্ট কাজ চালানোর মতো জ্ঞান ও শক্তি থাকতে হবে।
৩. আমানতদার: যিনি জনগণের সম্পদ এবং অধিকার আত্মসাৎ করবেন না।
৪. জনদরদী: যার মধ্যে মানুষের সেবা করার মানসিকতা আছে, দম্ভ বা অহংকার নেই।
​সতর্কবার্তা:
টাকা বা কোনো পার্থিব লাভের বিনিময়ে ভোট দেওয়া ‘ঘুষ’ (Rishwah) এর অন্তর্ভুক্ত, যা ইসলামে অভিশপ্ত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
​لَعْنَةُ اللَّهِ عَلَى الرَّاشِي وَالْمُرْتَشِي
“ঘুষ দাতা এবং ঘুষ গ্রহীতা উভয়ের ওপর আল্লাহর লানত।” (সুনানে ইবনে মাজাহ)


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর পড়ুন
এক ক্লিকে বিভাগের খবর