শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৩:৩৫ অপরাহ্ন

ই-পেপার

জামালপুরে ঘর আছে রাস্তা নেই

চলনবিলের আলো ডেস্ক:
আপডেট সময়: বুধবার, ৩১ আগস্ট, ২০২২, ১০:৪৮ পূর্বাহ্ণ

জামালপুর সদর উপজেলার তিতপল্লা ইউনিয়নের তিতপল্লা মধ্যপাড়া গ্রামের হতদরিদ্র বাসিন্দা দুলাল উদ্দিন। ২০২১ সালের ২৩ জানুয়ারি মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের প্রথম পর্যায়ের ঘর পেয়েছিলেন তিনি ও তার ভাই দুদু মিয়া। উপজেলা প্রশাসন থেকে তাদেরকে ঘরের কবুলিয়ত দলিলসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বুঝিয়ে দেয়ার পর আনন্দে উচ্ছ্বসিত হলেও সেই আনন্দ এখন পরিণত হয়েছে বিষাদে।

কাগজপত্র বুঝে পেলেও ঘর বুঝে পাননি তারা। সেই ঘর দুটির চারিদিকে অন্যের জমি থাকায় ব্যাপক অসুবিধার মধ্যে পড়েছেন তারা। যাতায়াতের রাস্তা না থাকায় দেড় বছর যাবত সেই ঘরে উঠতে পারছেন দুলাল উদ্দিন। বাধ্য হয়ে পরিবারের ৬ সদস্য নিয়ে অন্যের জমিতে ঝুপরি ঘরে অমানবিকভাবে বসবাস করছেন।

দুলাল উদ্দিন বলেন, ‘মাইনসের জমির উপর দিয়ে আঙ্গরে যাতায়াত করবের দেয় না। যাতায়াত করলেই গালিগালাজ করে ধইরে মাইর ধর করে। এইসব নিয়ে মেলা শালিসি হয়ছে। এহন এডা ঝুপড়ি ঘর তুইলে বসবাস করতাছি।’

দুলাল উদ্দিন আরো বলেন, দেড়টা বছর হইলো ঘর দুইটাতে কেউ থাহে না। ঘরগুলা নষ্ট হইতাছে। ঘরটার রং করবের পাইতাছি না। এইভাবে চলতে থাকলে ঘর দুইটা এহেবারে নষ্ট হয়ে যাবো।’

একই অবস্থা তার ভাই দুদু মিয়ারও। দুদু মিয়ার স্ত্রী রহিমা খাতুন বলেন, ‘এই ঘর আর আস্তা (রাস্তা) বুইঝে পাওয়ার জন্য কতো মানুষের কাছে যে গেছি। চেয়ারম্যান, মেম্বর, সিএ অফিস (উপজেলা প্রশাসন), ডিসি অফিস। সব জায়গায় গেছি। কেউ কোনো কিছু করলো না। এই ঘর দুইডা দেওয়ার চেয়ে না দেওয়াই ভালো আছিলো।’

অন্যদিকে একই ইউনিয়নের সুলতান নগর গ্রামে একই সময়ে মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর পায় ৫টি পরিবার। সেখানেও যাতায়াতের পথ না থাকায় ব্যাপক অসুবিধার মুখে পড়েছেন কুদ্দুস মিয়া, শাহিন, শরাফত, আব্বাস, সেজনুর পরিবারের ১৯ সদস্য।

ভুক্তভোগী পরিবারগুলো জানান, রাস্তা না থাকায় চলাচলের অসুবিধাসহ কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও অসুবিধার মুখে পড়েছেন তারা। এমনকি বাড়ির ভেতর থেকে মরদেহ নিয়ে যাবার রাস্তাও না থাকায় মানসিক অশান্তিতে রয়েছেন তারা।

উপকারভোগী আব্দুল কুদ্দুস বলেন, ‘আমার পুলাপান (ছেলেমেয়ে) একটা ভ্যান বাড়িতে রাখবো- এই উপায় নাই। মাইনসের বাড়িতে রাখা লাগে তাও টাকা দিয়ে। এই ঘর এহন আঙ্গর গলার কাটা হয়ে গেছে।’

উপকারভোগী আব্দুল কুদ্দুসের স্ত্রী শান্তি বেগম বলেন, ‘আমরা কেউ মারা গেলে আঙ্গর (আমাদের) লাশ লম্বা কইরে বাইরে নেয়া লাগবো। খাটিয়া দিয়ে নেয়ার কোনো রাস্তা নাই। এই জ্বালায় আমরা আছি। সবাই খালি আশ্বাস দেয়, কিন্তু কেউ সমাধান দেয় না।’ এদিকে যাতায়াতের রাস্তা না থাকায় প্রতিবেশীদের জায়গা ব্যবহার করায় মাঝে মধ্যেই বাধা ও হুমকির মুখে পড়তে হচ্ছে ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের। এতে চরম বিপাকে পড়েছেন তারা।

উপকারভোগী আব্বাস মিয়া বলেন, ‘এই রাস্তার জন্য অনেক কিছু হয়ে গেছে। প্রতিবেশীদের সাথে প্রায় প্রতিদিনই ঝগড়া, বিবাদ হইতাছে। এহন এমন একটা জ্বালা হইছে। না পাইতাছি ঘর ছাড়তে, না পাইতাছি ঘরে থাকবের।’

উপকারভোগী শাহিন মিয়ার ছেলে মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘এখন সরকার আমাদের কোনো রাস্তা দেয় নাই। না কি এই রাস্তা দখল হয়ে গেছে সেটি আমরা বুঝতে পারতাছি না। এই রাস্তার জন্য কতো জায়গায় গেলাম। কেউ কোনো সমাধান দিলো না।’

জামালপুরের মানবাধিকার কর্মী জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, প্রশাসনের উদাসীনতা ও অপরিকল্পিত কার্যক্রমের কারণে ভোগান্তিতে পড়েছে পরিবারগুলো। এই ঘরগুলো নির্মাণে যাদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিলো তারা সঠিকভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করেননি। বিষয়টি তদন্ত করে ঘরগুলো উপকারভোগীদের বসবাসের উপযোগী করে গড়ে তোলাসহ যারা দায়িত্বে অবহেলা করেছেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া উচিত। আর প্রয়োজনে নতুন করে জমি নিয়ে ওদের রাস্তা দেয়া উচিত।

এসব বিষয়ে জামালপুর সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা লিটুস লরেন্স চিরান বলেন, বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর পড়ুন
এক ক্লিকে বিভাগের খবর