মধ্য যুগে বাংলা সাহিত্যের অমর কাব্য “মনসা মঙ্গল” রচয়িতা অমর কবি বিজয় গুপ্ত’র বিজয় গুপ্ত’র প্রতিষ্ঠিত “মনসাকুন্ড” খ্যাত বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার গৈলা গ্রামে প্রতিষ্ঠিত ৫শ ২৮বছর বছরের পুরোনো, প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী মনসা মন্দিরে দেবী মনসার বার্ষিক পুজা মহাআড়ম্বড়ের মধ্যদিয়ে ১৭ আগস্ট বুধবার অনুষ্ঠিত হবে। এর আগে ১১ থেকে ১৩ আগস্ট মন্দির আঙ্গিনায় অনুষ্ঠিত হয়েছে তিন দিন ব্যাপী রয়ানী গান।
পঞ্জিকা অনুযায়ি, প্রতিবছর শ্রাবণ মাসের শেষ দিনে বিষ হরি বা মনসা দেবীর পূঁজা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
গৈলা কবি বিজয় গুপ্ত’র স্মৃতি র¶া মনসা মন্দির সংর¶ণ ও উন্নয়ন কমিটির সভাপতি সাবেক প্রধান শিক্ষক তারক চন্দ্র দে জানান, “ধর্ম যার যার উৎসব সবার”-এ বাক্যর অন্যন্য উদাহরনে কবি বিজয় গুপ্ত প্রতিষ্ঠিত মনসা মন্দিরে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে বার্ষিক পুজায় স্থানীয়সহ দেশ-বিদেশের হাজার হাজার ভক্ত ও পূন্যার্থীরা মা মনসার পায়ে শ্রদ্ধাঞ্জলী নিবেদনের জন্য পূষ্পার্ঘ্য, দুধ, কলা, মিস্টি ও মানত নিয়ে মন্দিরে আসেন পুজা দিতে। বুধবার সকাল ৮টা থেকে পুজা শুরু হয়ে চলবে সন্ধ্যা পর্যন্ত। সন্ধ্যা পর্যন্ত পুজার মধ্যে সকাল ১০টায় এবং দুপুর ২টায় অনুষ্ঠিত হবে ছাগ (পশু) বলিদান। ভক্তদের মনস্কামনা পুরণ ও পুন্য লাভের আশায় পুজা, ছাগ বলিদান, যাগযজ্ঞ অনুষ্ঠিত হবে। বিতরণ করা হবে মহাপ্রসাদ।
থানা অফিসার ইন চার্জ মো. গোলাম ছরোয়ার জানান, দেশের ঐতিহ্যবাহী মনসা মন্দিরের পুজায় আগত ভক্ত ও দর্শনার্থীদের সার্বিক নিরাপত্তা ও শৃংখলায় পুলিশ দুই স্তরের নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহন করেছে। পুজার আগের দিন মঙ্গলবার মনসা মন্দির ও তৎ সংলগ্ন এলাকাও পরিদর্শন করেছেন ওসি মো. গোলাম ছরোয়ার। পুলিশের পাশপাশি নিরাপত্তার দায়িত্বে মন্দির ও পুজা কমিটির নেতৃবৃন্দরাও দ্বায়িত্ব পঅরন করবেন বলে জানান ওসি।।
মনসা মঙ্গল কাব্য, ইতিহাস ও জনশ্রæতি মতে, আজ থেকে ৫শ ২৮বছর আগে মধ্য যুগে সুলতান হোসেন শাহ্র রাজত্ব আমলে ইংরেজী ১৪৯৪ সনে কবি বিজয় গুপ্ত সর্পের দেবী মনসা বা বিষ হরি (বিষ হরণকারী) দেবী কর্র্তৃক ¯^প্নে দেখে নিজ বাড়ির সু-বিশাল দীঘি থেকে পুজার একটি ঘট তুলে গৈলা গ্রামের নিজ বাড়িতে দেবী মনসার মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। পরে দেবী মনসার ¯^প্ন আদেশে দিঘীর ঘাটের পাশ্ববর্তি একটি বকুল গাছের নীচে বসে “পদ্মপুরাণ” বা “মনসা মঙ্গল” কাব্য রচনা করেন তিনি।
বাংলা সাহিত্যের তৎকালীন অন্যতম পৃষ্ঠপোষক সুলতান হোসেন শাহ্র রাজত্বকালে ওই বছরই বিজয় গুপ্ত মনসা মঙ্গঁল রচনার জন্য রাজ দরবারে “মহা কবি”র খেতাবে প্রতিষ্ঠিত হন।
জনশ্রæতি রয়েছে, দেবী পদ্মা বা মনসা বিজয় গুপ্তের কাব্য রচনায় সন্তুস্ট হয়ে আশির্বাদ হিসেবে বিজয় গুপ্তকে ¯^প্নে বলেছিলেন “তুই নাম চাস, না কাজ চাস?” উত্তরে বিজয় গুপ্ত বলেছিলেন “আমি নাম চাই”। যে কারনে তার নাম বিশ্বব্যাপি ছড়িয়ে পড়লেও তিনি দেহত্যাগ করেছেন উত্তরাধিকার বিহীন। ঐতিহাসিকভাবে বিজয় গুপ্তর সঠিক জন্ম বা মৃত্যুর তারিখ জানা জায়নি। তবে গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে সম্ভবত ৭০ বছর বয়সে ১৫২০ খ্রিষ্টাব্দে কাশীধামে বিজয় গুপ্ত দেহত্যাগ করেন। সেই হিসেবে তার জন্ম ১৪৫০ খ্রিষ্টাব্দে। ৪৪ বছর বয়সে তিনি মনসা মঙ্গল কাব্য রচনা করেন। মহাকবি বিজয় গুপ্তের পিতার নাম সনাতন গুপ্ত ও মাতার নাম রুক্সিনী দেবী।
বিজয় গুপ্তর আগেও একাধিক পন্ডিত ও কবিগন মনসা মঙ্গল রচনা করেছিলেন। যার মধ্যে অন্যতম ছিলেন ময়মনসিংহ’র কানা হরি দত্ত। তবে তারা কেউ তাদের কাব্যে দিন, তারিখ ও সন লিপিবদ্ধ করেন নি। বিজয় গুপ্তই সর্বপ্রথম তাঁর রচিত মনসা মঙ্গল কাব্যে সর্ব প্রথম ইংরেজী তারিখ ও সনের লিপিবদ্ধ করেন।
অন্যান্যদের তুলনায় বিজয়গুপ্তর কাব্য নিরস হলেও নৃপতি তিলক’র (সুলতান হোসেন শাহ) গুণ-কীর্তন ও ইংরেজী তারিখ ও সনের লিপিবদ্ধ করায় বিজয় গুপ্তই হয়ে ওঠেন মনসা মঙ্গল কাব্য রচয়িতাদের মধ্যে অন্যতম। আর এ কারণে রাজ দরবারে “মহা কবি” খেতাব পাওয়ার পর ভারতবর্ষসহ পৃথিবীরে বিভিন্ন দেশে মহা ধুমধামের সাথে মনসা দেবীর পুজার প্রচলন ঘটে। যা আজ পর্যন্ত অব্যাহত বিদ্যমান রয়েছে।
গৈলা কবি বিজয় গুপ্ত’র স্মৃতি র¶া মনসা মন্দির সংরক্ষণ ও উন্নয়ন কমিটির উপদেষ্টা একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক ও কলামিস্ট বীর মুক্তিযোদ্ধা অজয় দাসগুপ্ত জানান, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলা কালীন সময়ে পাকিস্তানী বর্বর সেনারা বিজয় গুপ্ত মন্দির থেকে মনসা দেবীর পাথরের বিগ্রহ চুরি করে নিয়ে যায়। স্বাদীনতা উত্তর সময়ে প্রতিষ্ঠিত ঘট ও নির্মিত প্রতীমায় পুজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় দেশ বিদেশের ভক্তবৃন্দর আর্থিক অনুদানে ২০০৮ সালে প্রায় ১টন ওজনের পিতলের তৈরি মনসা দেবীর প্রতিমা পূণঃ স্থাপন করা হয়।
বর্তমানে মনসা মন্দিরটি ধর্মীয় উপাসনালয়ের পাশাপাশি আধুনিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবেও সর্বত্র ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে। বরিশাল জেলা প্রশাসনের দর্শনীয় স্থানের তালিকার শীর্ষে রয়েছে ঐতিহাসিক বিজয় গুপ্তের মনসা মন্দিরের নাম। বিচারপতি, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রি, সচিব, বিদেশী কুটনৈতিকগন, বিভিন্ন দূতাবাসের কর্মকর্তাগনসহ দেশের খ্যাতনামা ব্যক্তিরা দর্শনে আসেন দেবী মনসার প্রতীমা ও ঐতিহাসিক মনসা মন্দির। দেশ-বিদেশের পুণ্যার্থী, দর্শক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের পর্যটনের উল্লে¬খযোগ্য স্থান হিসেবে রয়েছে এ মন্দিরের শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি।