বুধবার, ০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০২:৪৩ অপরাহ্ন

ই-পেপার

শিরোনাম :
শিরোনাম :
পবিত্র শবেবরাতে বেনাপোল-পেট্টাপোল বন্দর দিয়ে আমদানি রপ্তানি বন্ধ নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের দাবিতে চাটমোহরে সরকারি কর্মচারীদের অবস্থান,বিক্ষোভ কর্মসূচি “জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ” গুরুদাসপুরে পুরস্কার পেলেন বিজয়ী শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির প্রভাব বাংলাদেশে পড়বে না -বিজিবি কক্সবাজারে সাংবাদিকের কাছে ১ লক্ষ টাকা চাঁদা দাবি: না পেয়ে গাড়ি ছিনতাই ও স্ত্রীকে শ্লীলতাহানি বিএনপি’র সকল নেতাকর্মীদের ঘোড়া মার্কা প্রতীকের নির্বাচনের আহবান জানিয়ে সংবাদ সম্মেলন আটোয়ারী মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা ফ্ল্যাট কেনা থেকে শুরু করে বিক্রয়োত্তর সেবা মিলবে যে মেলায়

সাতক্ষীরায় ভুয়া সাংস্কৃতিক সংগঠনের নামে টাকা বরাদ্দ

আব্দুস সামাদ, সাতক্ষীরা:
আপডেট সময়: মঙ্গলবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২১, ৯:৩৭ অপরাহ্ণ

সাতক্ষীরার ২৫টি সাংস্কৃতিক সংগঠনকে সাত লাখ ৮০ হাজার টাকা অনুদান দেওয়া হয়েছে। গত ৯ জুন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে এ অনুদান দেওয়া হয়। অনুদান পাওয়া ২৫টি সংগঠনের মধ্যে নামমাত্র কয়েকটির অস্তিত্ব আছে। বাদবাকিগুলোর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি।

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট সাতক্ষীরা জেলা শাখার সভাপতি নিজস্ব একাধিক সংগঠনের নাম অন্তর্ভুক্ত করে টাকা উত্তোলন করে হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ৯ জুন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব নাজমা বেগম স্বাক্ষরিত ২০২০-২০২১ অর্থবছরে চারুকলা থিয়েটার খাত সাতক্ষীরা জেলার ২৫টি সাংস্কৃতিক সংগঠনকে সাত লাখ ৮০ হাজার টাকা অনুদান দেওয়া হয়। ৭ জুলাই জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে অনুদানের চেক বিতরণ করা হয়েছে।
এদিকে, ২০২১-২২ অর্থবছরের অনুদানের জন্য আবার আবেদনপত্র জমা দেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে। চলবে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এ অর্থবছরেও এসব ‘ভুয়া’ সংগঠন থেকে আবেদন করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
২০২০-২১ অর্থবছরে বরাদ্দ পাওয়াদের তালিকা থেকে দেখা যায়, ২৫টি সংগঠনের মধ্যে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট সাতক্ষীরা জেলা শাখার সভাপতি আবু আফফান রোজবাবুর নিজস্ব সংগঠন ‘লিনেট ফাইন আর্টসের’ নামে ৪০ হাজার টাকা, তার স্ত্রী দিলরুবা রুবির ‘আজমল স্মৃতি সংসদের’ নামে ৩০ হাজার টাকা এবং বাইরের সংগঠনের শাখা ‘বিশ্বভরা প্রাণের’ নামে ৩০ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। এ তিনটি সংগঠনের ঠিকানা মুনজিতপুর বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই তিন সংগঠনের বরাদ্দের এক লাখ টাকা হাতিয়েছেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট সাতক্ষীরা জেলা শাখার সভাপতি আবু আফফান রোজবাবু।
এদিকে, সাতক্ষীরা পলাশপোল এলাকার ‘সাম্প্রতিক সাহিত্য ও আবৃত্তি সংসদের’ নামে ৩০ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। এ সংগঠনের সভাপতি আমিরুল বাসার ২৪-২৫ বছর ঢাকায় আছেন। প্রায় দুই যুগ আগে তিনি এ সংগঠনটি গড়েন। দীর্ঘদিন এটির কোনো কার্যক্রম না থাকলেও অজ্ঞাত কারণে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট সাতক্ষীরা জেলা শাখার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সুপারিশে এ সংগঠনকে দেওয়া হয়েছে বরাদ্দ।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পলাশপোল শহীদ কাজল সরণির নুর সুপার মার্কেটে অবস্থিত জেলা সাহিত্য পরিষদকে ৩০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। এটি একটি রাজনৈতিক দলের সাহিত্য সংগঠন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে। তবে সংশ্লিষ্ট স্থানে খোঁজ নিয়ে এমন সংগঠনের সন্ধান পাওয়া যায়নি। সংগঠনের কথিত সভাপতি শহিদুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘নুর সুপার মার্কেটে একটি সাইনবোর্ড ছিল। কিন্তু কয়েক বছর সেটি আর নেই। ঠিকানা পরিবর্তন করে একটি ওয়ার্কশপে বর্তমানে কার্যক্রম পরিচালনা করছি।’
সাতক্ষীরার বড়বাজার এলাকার সংগঠন ‘কবিতাকুঞ্জের’ নামে ৪০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ সংগঠনের সভাপতি ছিলেন বিশিষ্ট সাংবাদিক মুফতি আব্দুর রহিম কচি। তিনি মারা যাওয়ার পর এটির কোনো কার্যক্রম দেখা যায়নি। সিরাজুল ইসলাম নামে অবসরপ্রাপ্ত এক ব্যাংক কর্মকর্তা এ সংগঠনের নাম ব্যবহার করে টাকা উত্তোলন করেছেন।
কাটিয়া আনন্দপাড়ায় ‘বঙ্গবন্ধু আবৃত্তি পরিষদ’ সাতক্ষীরা জেলা শাখার নামে ৩০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। গায়ক তৃিপ্তমোহন মল্লিকের বাড়ির ঠিকানা ব্যবহার করে এ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। এ সংগঠনের সভাপতি মন্ময় মনির।
মুনজিতপুরে আজমল স্মৃতি সংসদকে দেওয়া হয়েছে ৩০ হাজার টাকা। এ সংগঠনের সভাপতি দিলরুবা রুবি। তিনি জেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট ও ‘লিনেট ফাইন আর্টসের’ সভাপতি আবু আফফান রোজবাবুর স্ত্রী। মুনজিতপুরে ‘বিশ্বভরা প্রাণে’ নামে একটি সংগঠনকে দেওয়া হয়েছে ৩০ হাজার টাকা। এটি জেলার বাইরের সংগঠনের স্থানীয় শাখা। নিয়ম অনুসারে এ সংগঠনের কোনো আর্থিক সহায়তা পাওয়ার কথা না। কিন্তু এ সংগঠেনের সাথে জেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি সম্পৃক্ত থাকায় নিয়মবহির্ভুতভাবে দেওয়া হয়েছে অনুদান।
খোঁজ নিয়ে আরও জানা যায়, ‘মৌচাক সাহিত্য পরিষদকে’ দেওয়া হয়েছে ৩০ হাজার টাকা। এটি জামায়াত ইসলামের সাতক্ষীরা জেলার সাহিত্য সংগঠন বলে পরিচিত। এ সংগঠনের দায়িত্বে আব্দুর রশিদ সুমন ও আব্দুল ওহাব আজাদ।
পুরাতন সাতক্ষীরার ‘সাতসুরে আমরা’, একই এলাকার ‘সবুজ সংঘ’, সাতক্ষীরার ‘নিউ রংমহল পুতুলনাচ’, ‘নিউ নিজাম পুতুলনাচ’, ‘বাগানবাড়ি শিল্পী কল্যাণ সংস্থা’, ‘সুলতানপুর সাংস্কৃতিক ও নাট্যগোষ্ঠী’ এবং সুলতানপুরের ‘সপ্তর্ষি থিয়েটার’কে ৩০ হাজার করে টাকা দেওয়া হয়েছে। তবে, এসব সংগঠনের কোনো কার্যক্রম বা অফিস খুঁজে পাওয়া যায়নি।
এছাড়াও, পলাশপোলের ‘অধীতি কণ্ঠকলা’, মহিলা কলেজ রোডের ‘আলামিন ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক একাডেমী’ এবং শ্যামনগর উপজেলার নকিপুরের ‘বাদঘাটা জাগো যুব ফাউন্ডেশন’কে ৩০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। এসব সংগঠনের কোনো তথ্য জেলার প্রবীণ লেখক বা সাহিত্যিকরা দিতে পারেনি।
তবে মুনজিতপুরের ‘লিনেট ফাইন আর্টস, প্রাণসায়ের ‘বর্ণমালা একাডেমী’, পলাশপোলের ‘দীপালোক একাডেমী’, শহীদ নাজমুল সরণি মাস্টারপাড়ার ‘স্বরলিপি একাডেমী’, শহীদ নাজমুল সরণির ‘সব্যসাচী আবৃত্তি সংসদ’, সুলতানপুরের ‘সাতক্ষীরা খ্রীশ্চিয়ান কালচারাল একাডেমী’ এবং পলাশপোলের ‘ঈক্ষণ সাংস্কৃতিক সংসদ’-এর কার্যক্রম রয়েছে। এই সংগঠনগুলোও ৩০ হাজার টাকা করে পেয়েছে।
জেলার প্রবীণ লেখক ও সাহিত্যিকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এ বরাদ্দ প্রতি বছরই দেওয়া হয়। তবে ফি বছর এমন কিছু সংগঠনকে অনুদান দেওয়া হচ্ছে, যাদের কোনো অস্তিত্ব নেই। শুধুমাত্র টাকা উত্তোলনের জন্য কাগজপত্র ঠিকঠাক করে রাখছেন এসব সংগঠনের কর্তারা। আবার অনেকে একাধিক সংগঠনের সাথে যুক্ত থেকে সরকারি অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন। এছাড়াও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কোনো ঠিকানা এবং কর্মকা- না থাকলেও বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন দেখিয়ে ভুয়া বিল-ভাউচার দাখিল করা হচ্ছে।
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট সাতক্ষীরা জেলা শাখার সভাপতি আবু আফফান রোজবাবুর কাছে এসব অনিয়মের বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়। তিনি বলেন, ‘এ বিষয় নিয়ে আপনাদের এতো মাতামাতি কেন? কে টাকা পেল আর কে পেল না তাতে আপনাদের কী আসে যায়? আমি ৬০ বছর এ শহরে বসবাস করছি। সকলে আমাকে চেনে। আমার কাছ থেকে ফ্যাক্স পাঠিয়ে জেলার বড় বড় সাংবাদিক তৈরি হয়েছে। আপনি লিখে কী করবেন?’
আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এ টাকা পেতে আমাদের স্বাক্ষরের প্রয়োজন হয় না। এসব সংগঠন প্রতি বছরই টাকা পেয়ে থাকে। কোনো কার্যক্রম থাক বা না থাক বছর বছর কাগজপত্র নবায়ন থাকলে তারা টাকা পায়। এটি এতো বেশি যাচাই বাছাই করা হয় না।’
নিজ এবং পরিবার মিলিয়ে তিন সংগঠনের নামে টাকা উত্তোলনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি একটা সংগঠনের সভাপতি। বাকিগুলোর সাথে আমি যুক্ত আছি এটা সত্য। আমি শিল্পী মানুষ। একাধিক সংগঠনের সাথে যুক্ত থাকলে সমস্যা কোথায়?’
সাতক্ষীরা জেলা কালচারাল অফিসার সুজিত রায় বলেন, ‘২৫টি সংগঠনকে অনুদান দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি সংগঠনের কার্যক্রম নেই বলে জানতে পেরেছি। তবে যাচাই-বাছাইয়ের সময় সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের প্রতিনিধিদের সমর্থন থাকায় বাদ দেওয়া সম্ভব হয়নি।’
তিনি আরও বলেন, এ অর্থবছরের জন্য নতুন করে আবেদন নেওয়া হচ্ছে। তাতে যদি এ ধরনের কোনো সংগঠনের নাম আসে সেগুলো যাচাই-বাছাই করে দেখা হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর পড়ুন
এক ক্লিকে বিভাগের খবর