যশোরের অভয়নগরে হঠাৎ করেই বেড়ে যাওয়া করোনার প্রভাবে লাগাম ছুটতে শুরু করেছে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের। শিল্পাঞ্চল এলাকা হিসেবে পরিচিত অভয়নর নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে শুরু হয়েছে ‘বোবা কান্না’।
বিশেষ করে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে চলা দ্রব্যমূল্যের কারণে ক্ষোভে ফুঁসছেন অভয়নগর উপজেলার নিম্নআয়ের মানুষ। সামনের দিনগুলোতে এ দ্রব্যমূল্যের লাগাম টেনে না ধরলে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের বোবা কান্না শেষ পর্যন্ত ক্ষোভের উদগিরণে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে
এদিকে দ্রব্যমূল্যের হঠাৎ বৃদ্ধির বিষয়টি স্বীকার করে অভয়নগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ আমিনুর রহমান জানিয়েছেন, যে কোনো মূল্যে কৃত্রিম সংকট রোধে বাজার মনিটরিং ও মজুতদারি বন্ধ করা হবে।
জানা গেছে, শিল্পাঞ্চল অভয়নর নওয়াপাড়ার মানুষই জীবিকার টানে কাজ করেন। বৃহত্তম শিল্প কল কারখানার সঙ্গেই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষাভাবে কাজ করছেন প্রায় লক্ষ্যধিক মানুষ। এছাড়াও বিভিন্ন অটোরিকশা ও অটো ভ্যান চালিয়ে দিন চলে মানুষের যা কঠোর লকডাউনে সব আয় রোজগার বন্ধ রয়েছেন।
গত বছরে লকডাউন পরিস্থিতির কারণে চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়েছিল এ বিশাল জনগোষ্ঠীকে। জনপ্রতিনিধি ও সরকারের তরফ থেকে পাওয়া ত্রাণের বাইরে জীবিকার মাধ্যম হারিয়ে বেশির ভাগ নিম্নআয়ের মানুষই দিন কাটিয়েছেন অবর্ণনীয় দুর্দশায়।
তবে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে ছিলেন মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। কারণ এসব পরিবারের লোকজন মুখ খুলে কাউকে বলতেও পারেননি কিংবা হাত পাততে পারেননি। সেই লকডাউন পরিস্থিতি কাটিয়ে গত কয়েক মাসে সাধারণ জীবনে ফিরে আসার চেষ্টায় থাকা এসব নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোর জন্য কঠিন বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আবারও কঠোর লকডাউনে পড়া অভয়নগরের মানুষ দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন বৃদ্ধি।
সরেজমিন দেখা যায়, ভোজ্যসামগ্রীর অন্যতম বৃহৎ মোকাম নওয়াপাড়া বড় বাজার, বউবাজার চেংগুটিয়া এলাকায় গিয়ে পাওয়া গেছে এর সত্যতা। জানা গেছে, গত ১ মাসে গুঁড়োদুধের দাম কেজিতে বৃদ্ধি পেয়েছে ২৮ থেকে ৩০ টাকা। শিশুখাদ্যের মূল্যও একইভাবে বেড়ে চলেছে দিনের পর দিন। এছাড়াও সয়াবিন তেল খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১৩৮ থেকে ১৪০ টাকা; যা গত মাসের তুলনায় ৩০ টাকা বেশি। মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে ৫৫ টাকা কেজি; যা আগের চেয়ে কেজিতে বেড়েছে ৬-৭ টাকা এবং চিকন চাল বিক্রি হচ্ছে ৬৫ থেকে ৬৭ টাকা দরে।
এছাড়াও ডাল, চিনিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোজ্যসামগ্রীর দাম বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। এই মূল্যবৃদ্ধি আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন খোদ ব্যবসায়ীরাই।
এলাকার বেশ কয়জন জুট মিল শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, করোনার মধ্যে জুট মিলেও ঠিক ভাবে কাজ হয়না, বেশকিছু জুট মিল বন্ধ। বেতন বাড়েনি। একই সমস্যা অনেক মানুষের। কিন্তু বাজারে মূল্য বৃদ্ধিতে আমরা দিশেহারা।
কয়েকজন ব্যাংক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, আমাদের বেতন দিয়েই চলতে হয়, বলতে পারেন মাপা টাকা। কিন্তু বর্তমান বাজার দরে আমরা হিমশিম খাচ্ছি। কাউকে তো কিছু বলতেও পারি না। কিন্তু ক্রয়ের সক্ষমতা হারাতে বসেছে সাধারণ খেটেখাওয়া মানুষ। উপার্জনের সঙ্গে মিল-অমিলের হিসাব কষতে গিয়ে আমাদের বোবা কান্না কাউকে দেখানোর উপায় নেই।
এদিকে ঈদুল আজহা যত ঘনিয়ে আসবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে বলে ধারণা করছেন অনেকেই। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন স্কুলশিক্ষক জানান, অভয়নগরে হঠাৎ করেই করোনার প্রকোপ বেড়ে গেছে। সামনে কী হয় এ নিয়ে গুজবের ডালপালাও মেলছে। আবার ঈদুলআজহা ও ঘনিয়ে আসছে। এমনিতেই ঈদের আগে জিনিসপত্রের দাম দাম বেড়ে যাওয়ার ঘটনা স্বাভাবিক হয়ে গেছে। তাই সামনে কী আছে আমাদের ভাগ্যে জানি না।
এদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ আমিনুর রহমান জানিয়েছেন, দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধির ব্যাপারে আমরা জেনেছি এবং ইতোমধ্যেই এ ব্যাপারে জরুরি সভা হয়েছে। ঈদুল আজহা ও করোনা কিছুটা বেড়ে যাওয়ায় আমরা এ ব্যাপারে কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সরকার নির্ধারিত দ্রব্যমূল্য নিশ্চিত করতে উপজেলার পাইকারি ও খুচরা বাজারে চলতি সপ্তাহেই ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে এবং এ অভিযান নিয়মিত চলবে।
#চলনবিলের আলো / আপন