যশোরের অভয়নগর উপজেলার প্রাণকেন্দ্র দিয়ে প্রবাহিত ঐতিহ্যবাহী ভৈরব নদ আজ অস্তিত্ব সংকটে। অভিযোগ উঠেছে, প্রভাবশালী একটি চক্র নদীবন্দর কর্তৃপক্ষের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে অবৈধ জেটি নির্মাণ, নদী ভরাট ও তীর দখল করে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে শিল্প-বাণিজ্যনির্ভর নওয়াপাড়া অঞ্চল গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
অবৈধ জেটি ও ভরাটে সংকুচিত নদীপথ
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক বছরে নদীর দুই তীরে একাধিক অবৈধ জেটি গড়ে তোলা হয়েছে। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে নদীর পাড় কেটে ও বালু ফেলে ভরাট করে নির্মাণ করা হয়েছে বহুতল ভবন, গুদামঘর ও শিল্পকারখানা। এতে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ বাধাগ্রস্ত হয়ে জোয়ার-ভাটার পানির স্রোত কমে গেছে। নদীবিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর প্রস্থ কমে গেলে এবং স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি হলে পলি জমে দ্রুত নাব্যতা হ্রাস পায়। ইতোমধ্যে ভৈরব নদের বিভিন্ন অংশে গভীরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় নৌযান চালকরা। কার্গো-লাইটার চলাচলে বিঘ্ন, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসা অভয়নগরের শিল্প-বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র নওয়াপাড়া মূলত নদীপথনির্ভর। প্রতিদিন অসংখ্য কার্গো ও লাইটার জাহাজে সার, খাদ্যশস্য, সিমেন্ট, কয়লা ও অন্যান্য শিল্প কাঁচামাল আনা-নেওয়া হয়। কিন্তু নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় বড় জাহাজ মাঝনদীতে আটকে পড়ছে, অনেক ক্ষেত্রে অর্ধেক মাল খালাস করে হালকা করে চলাচল করতে হচ্ছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, এতে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে ২০-৩০ শতাংশ পর্যন্ত। সময়মতো কাঁচামাল না পৌঁছানোয় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, ক্ষতির মুখে পড়ছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা। পরিবেশগত বিপর্যয়ের আশঙ্কা
পরিবেশবিদদের মতে, নদী দখল ও ভরাট অব্যাহত থাকলে শুধু অর্থনীতি নয়, পুরো এলাকার পরিবেশগত ভারসাম্য হুমকির মুখে পড়বে। ভৈরব নদ স্থানীয় কৃষি, মৎস্য ও জীববৈচিত্র্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নদীর পানি প্রবাহ কমে গেলে মাছের প্রজনন ব্যাহত হবে, বাড়বে জলাবদ্ধতা ও বন্যার ঝুঁকি। অভিযোগ রয়েছে, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণে প্রশাসনের কিছু অসাধু ব্যক্তি নীরব ভূমিকা পালন করছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্র দাবি করেছে, অবৈধ জেটি ও দখল টিকিয়ে রাখতে মাসোহারা লেনদেন হয়। যদিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। অভয়নগরবাসীর দাবি, অবিলম্বে অবৈধ জেটি উচ্ছেদ, নদী দখলমুক্ত করে সীমানা নির্ধারণ, জরুরি ভিত্তিতে ড্রেজিং কার্যক্রম চালু দখলদার ও সংশ্লিষ্ট দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে শিল্প-বাণিজ্যনির্ভর নওয়াপাড়া স্থবির হয়ে পড়বে এবং ভৈরব নদ পরিণত হবে মৃতপ্রায় খালে। অভয়নগরের মানুষের প্রশ্ন, প্রভাবশালীদের দখলদারিত্বে কি তবে হারিয়ে যাবে শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী ভৈরব নদ।