নার্স-কর্মচারীদের সহায়তায় ঢাকায় পাচার; ‘মায়ের সম্মতি’ বলে দায় এড়ানোর চেষ্টা। যশোরের অভয়নগর উপজেলার নওয়াপাড়ায় অবস্থিত রিজিয়া (প্রাঃ) মেমোরিয়াল হাসপাতাল থেকে সদ্য জন্ম নেওয়া এক নবজাতক নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় শিশুবিক্রির ভয়াবহ অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, হাসপাতালের ভেতরে সক্রিয় একটি সংঘবদ্ধ চক্র নবজাতককে গোপনে ঢাকায় পাচার করে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে বিক্রি করেছে। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
জন্মের পরপরই ‘গায়েব’ নবজাতক হাসপাতাল ও স্বজন সূত্রে জানা যায়, গত ২৯ জানুয়ারি যশোর সদর উপজেলার বসুন্দিয়া ইউনিয়নের কেফায়েত নগর মাঠপাড়া গ্রামের আবুল শেখ মিস্ত্রির মেয়ে ও মো. টুটুলের স্ত্রী মারুফা খাতুন (৩৬) সিজারিয়ান অপারেশনের জন্য হাসপাতালে ভর্তি হন। রেজিস্ট্রার অনুযায়ী, ওই দিন তাঁর গর্ভে জন্ম নেয় একটি পুত্রসন্তান।
স্বজনদের অভিযোগ, জন্মের কিছু সময় পর নবজাতককে আর মায়ের কাছে ফেরত দেওয়া হয়নি। এরপর থেকেই শিশুটির কোনো হদিস নেই।
একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, হাসপাতালের কয়েকজন নার্স ও কর্মচারীর সহায়তায় রহিমা বেগম ও রতনা নামের দুই নারী নবজাতককে হাসপাতাল থেকে বের করে নেন। পরে একটি প্রাইভেটকারে করে শিশুটিকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য, সেখানে একটি পাচারকারী চক্রের কাছে শিশুটিকে মোটা অংকের টাকায় বিক্রি করা হয়েছে।
প্রথমে ‘মৃত’, পরে ‘বিক্রি, দাদার বিস্ফোরক অভিযোগ নবজাতকের দাদা শামীম বলেন, প্রথমে আমাদের জানানো হয় বাচ্চাটি মারা গেছে। পরে জানতে পারি, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, ডাক্তার-নার্স ও আমার ছেলের বউয়ের স্বজনরা মিলে শিশুটিকে বিক্রি করে দিয়েছে। আমি আমার পুতাকে ফেরত চাই এবং জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় দেখতে চাই। দায় এড়াতে হাসপাতালের বক্তব্য শিশু নিখোঁজের ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে মা নিজেই শিশুটিকে ঢাকার উত্তরায় একটি পরিবারের কাছে দিয়েছেন। তবে এই দাবির পক্ষে কোনো লিখিত সম্মতিপত্র, আইনগত অনুমোদন বা চিকিৎসা ছাড়পত্র দেখাতে পারেনি তারা।
রিজিয়া (প্রাঃ) মেমোরিয়াল হাসপাতালের পরিচালক ডা. আইয়ুব আলী বলেন, অপারেশনের পর মা ও নবজাতক দু’জনই সুস্থ ছিলেন। আমি কোনো ছাড়পত্র দিইনি। কীভাবে শিশুটি হাসপাতাল থেকে বের হলো, তা আমার জানা নেই।
স্থানীয়দের দাবি, এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র হাসপাতালটিকে ব্যবহার করে নবজাতক পাচারের মতো জঘন্য অপরাধ চালিয়ে আসছে। আইনের চোখে ভয়াবহ অপরাধ আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযোগ প্রমাণিত হলে এটি মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২ এবং দণ্ডবিধির ৩৭২ ও ৩৭৩ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের দায় প্রমাণিত হলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও দায় এড়াতে পারবে না।
এ ঘটনায় অবিলম্বে মামলা গ্রহণ, হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজ জব্দ এবং সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাঁদের মতে, স্বাস্থ্য বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর ও নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন সম্ভব নয়।