শীতের শুরুতেই প্রকৃতি তার রূপ বদলায়। সেই পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগে গ্রামবাংলার ফসলের মাঠে, যেখানে চোখ জুড়ানো হলুদ রঙে শোভা পায় সরিষা ফুল। দিগন্তজোড়া মাঠজুড়ে সরিষা ফুলের সমারোহ শীতের আগমনী বার্তা নিয়ে আসে। হলুদের এই রঙ শুধু প্রকৃতিকে রাঙিয়ে তোলে না, বরং গ্রামাঞ্চলের মানুষের মনে জাগায় প্রশান্তি ও নতুন আশার আলো।
সরিষা ফুলের সৌন্দর্য বরাবরই অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে কবি ও সাহিত্যিকদের। প্রকৃতির এই অনন্য রূপ দেখতে শীত মৌসুম এলেই শহর থেকে ছুটে আসেন প্রকৃতিপ্রেমীরা। শীতের হালকা হাওয়া, হলুদ সরিষা ফুল আর চারপাশের সবুজ প্রকৃতি মিলিয়ে সৃষ্টি হয় এক অপরূপ দৃশ্য, যা মনকে করে তোলে প্রশান্ত।
এমন মনোমুগ্ধকর দৃশ্য এখন চোখে পড়ছে পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকার ফসলের মাঠে। দিগন্তজুড়ে বিস্তৃত জমিতে সদ্য ফোটা সরিষা ফুলে ছেয়ে গেছে পুরো এলাকা। এই সরিষা ফুলের সঙ্গে মিশে আছে হাজারো কৃষকের রঙিন স্বপ্ন। চলতি রবি মৌসুমে সরিষা চাষে ভালো লাভের আশায় বিভোর উপজেলার কয়েক হাজার কৃষক।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি রবি মৌসুমে উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নে বারি-৯, বারি-১৪ ও বারি-১৭সহ বিভিন্ন জাতের সরিষা প্রায় ৬ হাজার ৬৩০ হেক্টর জমিতে চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ১২ হাজার মেট্রিক টন। সংশ্লিষ্টরা জানান, লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও আবাদ আরও বাড়তে পারে।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকার মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, প্রায় সব এলাকাতেই কমবেশি সরিষার চাষ হয়েছে। কৃষকরা উন্নত জাতের পাশাপাশি দেশীয় রাই, চৈতা ও মাঘি জাতের সরিষার বীজ বপন করছেন। তবে প্রচলিত দেশি জাতের তুলনায় বারি-৯, বারি-১৪ ও বারি-১৫ জাতের ফলন বেশি হওয়ায় এসব জাতের দিকেই কৃষকদের আগ্রহ বেশি।
খানমরিচ ইউনিয়নের পাটুল গ্রামের কৃষক আব্দুর রহিম বলেন, এই এলাকায় সরিষার ফলন ভালো হয়। সরিষা ফুলের সৌন্দর্য দেখতে উপজেলা শহর থেকেও অনেক মানুষ আসেন। আমি এ বছর ছয় বিঘা জমিতে বারি-১৪ জাতের সরিষা চাষ করেছি। গাছের অবস্থা এখন পর্যন্ত বেশ ভালো। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ভালো ফলনের আশা করছি।
একই উপজেলার দিলপাশার ইউনিয়নের কৃষক নয়ন শেখ বলেন, ধানের পর সরিষা চাষ করলে খরচ কম হয় আর লাভও ভালো পাওয়া যায়। এবার জমিতে রোগবালাই কম, তাই ফলন নিয়ে আমরা আশাবাদী।
সরিষা ফুল দেখতে আসা ভাঙ্গুড়া পৌর এলাকার প্রকৃতিপ্রেমী সুজন আহমেদ বলেন, শহরের কোলাহল ছেড়ে এমন হলুদ মাঠে দাঁড়ালে মনটাই বদলে যায়। সরিষা ফুলের সৌন্দর্য আমাদের শেকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়।
আরেক প্রকৃতিপ্রেমী কলেজছাত্রী লামিয়া আক্তার বলেন, প্রতি বছর শীত এলেই সরিষা ফুল দেখতে গ্রামে আসি। এই দৃশ্য দেখলে সব ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। প্রকৃতি আমাদের কত সুন্দর উপহার দেয়, তা এখানে না এলে বোঝা যায় না।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শারমিন জাহান বলেন, “শীত মৌসুমে সরিষা ফুল ফুটলে শহরের মানুষ প্রকৃতি দেখতে গ্রামে আসেন, যা আনন্দের বিষয়। এতে তারা শহরের যান্ত্রিক জীবন থেকে কিছুটা হলেও মুক্তি পান। এ বছর উপজেলায় গত বছরের তুলনায় সরিষার আবাদ বেড়েছে। সরিষা চাষ আরও বাড়াতে কৃষকদের সব ধরনের কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।”