আজ ২৭শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১১ই আগস্ট, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

পদোন্নতি জট কমে আসছে প্রশাসনে

নিজস্ব প্রতিবেদক:

প্রশাসনে পদোন্নতি জট ক্রমেই স্বাভাবিক হয়ে আসছে। আগের মতো সময়ক্ষেপণের ঘানি আর টানতে হচ্ছে না। কর্মকর্তারা পরবর্তী ধাপে যাওয়ার জন্য যোগ্যতা অর্জনের কাছাকাছি সময়েই পদোন্নতির দেখা পাচ্ছেন। বড় তিনটি ব্যাচের বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা গেল দু’বছরে অবসরে যাওয়ায় এ সুযোগ তৈরি হয়েছে। এদিকে উপসচিব ও অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি দিতে এসএসবি বৈঠক শুরু হয়েছে। এছাড়া ইতোমধ্যে প্রশাসন ক্যাডারের সঙ্গে একীভূত হওয়া বিলুপ্ত ইকোনমিক ক্যাডার কর্মকর্তাদের পেন্ডিং পদোন্নতি নিয়েও আলোচনা হবে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র যুগান্তরকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। গত মাসে যুগ্মসচিব পদে পদোন্নতি বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অনেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে তাদের পদোন্নতির বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে আবেদন করেছেন। কেউ কেউ দৃঢ়ভাবে বলতে চেয়েছেন, পদোন্নতি পাওয়ার ক্ষেত্রে তাদের কোনো যোগ্যতার ঘাটতি ছিল না।

 

পদোন্নতি বিধিমালা অনুযায়ী সব শর্ত পূরণ ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা পদোন্নতি পাননি। এজন্য তাদের মধ্যে ক্ষোভ হতাশা বাড়ছে। সূত্র জানায়, উপসচিব পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে ২৭তম ব্যাচকে নতুন হিসেবে বিবেচনায় নেয়া হবে। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। করোনা পরিস্থিতির কারণে কিছুটা সময়ক্ষেপণ হয়েছে বলে পদোন্নতি প্রত্যাশীরা মনে করেন। এর আগে উপসচিব পদে ২৫তম ব্যাচের পদোন্নতি হয় ২০১৮ সালের ২৪ অক্টোবর। অপরদিকে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি দেয়ার জন্য ১৩তম ব্যাচকে বিবেচনায় নেয়া হবে। এ ব্যাচের কর্মকর্তারা যুগ্মসচিব পদে পদোন্নতি পেয়েছিলেন ২০১৭ সালের ২১ ডিসেম্বর। ইতোমধ্যে তাদের যোগ্যতা অর্জনের দু’বছর পার হয়েছে। অতিরিক্ত সচিব পদে সর্বশেষ পদোন্নতি হয় ২০১৯ সালের ২৩ অক্টোবর। এদিন পদোন্নতির দেখা পান ১১ ব্যাচের কর্মকর্তারা। সূত্র জানায়, প্রশাসনে দীর্ঘদিনের পদোন্নতি জট এভাবে ক্রমেই স্বাভাবিক হয়ে আসার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে বড় ৩টি ব্যাচের প্রায় দেড় হাজার কর্মকর্তার অনেকের অবসরে চলে যাওয়া। এর মধ্যে রয়েছে ৬৫০ জনের ৮২ (বিশেষ) ব্যাচ, ১৯৮৪ ব্যাচের ৪৫০ জন এবং ১৯৮৫ ব্যাচের ৫৫০ জন।

 

এছাড়া ১৯৮২ নিয়মিত ব্যাচের মাত্র ৮০ জন। আছে ১৯৮৬ ব্যাচের ২১৬ জন। মূলত ১৯৮২ বিশেষ, ’৮৪ ও ৮৫ ব্যাচের কারণে নিচের দিকে থাকা কয়েকটি ব্যাচের বহু কর্মকর্তার পদোন্নতি সময়মতো হয়নি। তারা এক রকম চিঁড়ে চ্যাপটা হয়ে গেছেন। পাশাপাশি বড় ব্যাচগুলোর মেধাবী কর্মকর্তাদেরও চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। তবে আগে যেখানে প্রতিটি ব্যাচকে পদোন্নতির জন্য যোগ্যতা অর্জনের পরও বছরের পর বছর বসে থাকতে হতো, এখন আর সেটি হচ্ছে না। প্রায় কাছাকাছি সময়ে পদোন্নতির দেখা মিলছে। যেমন ২৭তম ব্যাচের বেশির ভাগ কর্মকর্তা তাদের ৫ বছরের সিনিয়র স্কেল পূরণ করেছে গত বছর জুনে। অবশিষ্ট কিছু কর্মকর্তা দুই ধাপে ২-৩ মাস আগে সিনিয়র স্কেলের সময়সীমা অতিক্রম করেছে। নিয়ম হল সিনিয়র স্কেল বা সিনিয়র সহকারী সচিব পদে ৫ বছর চাকরি করলে তিনি উপসচিব পদে পদোন্নতির জন্য যোগ্য হবেন। ফলে ২৭তম ব্যাচের উপসচিব হওয়ার জন্য বেশি সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে না। একইভাবে গত মাসে ১৮তম ব্যাচ থেকে যুগ্মসচিব করা হয়েছে। যদিও তাদের কিছুটা সময় লেগেছে। কিন্তু এবার যদি ১৩তম ব্যাচ অতিরিক্ত সচিব পদোন্নতি পেয়ে যায়, তাহলে তারা যোগ্যতা অর্জনের মাত্র ৭ মাসের মাথায় পদোন্নতির দেখা পাবেন। যুগ্মসচিব পদে ২ বছর চাকরি করলে অতিরিক্ত সচিব হওয়ার যোগ্যতা অর্জিত হয়। পদোন্নতিবঞ্চিতদের ক্ষোভ হতাশা : গত ৫ জুন যুগ্মসচিব পদে ১৩২ জনকে পদোন্নতি দেয়া হয়।

 

এ সময় নিয়মিত ব্যাচ হিসেবে ১৮তম ব্যাচের ৯ জনসহ লেফটআউট তালিকা থেকে পুনরায় অনেকে বাদ পড়েন। ১৮তম ব্যাচ থেকে এক হিসেবে ১৬ জন বাদ পড়লেও খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ৭ জনের বিভিন্ন সমস্যা রয়েছে। ৩ জন তো এখনও সিনিয়র সহকারী সচিব পদে আটকে আছেন। একজন পদোন্নতি পাননি আলোচিত নারী কেলেঙ্কারির কারণে। অবশিষ্ট ৯ জন কর্মকর্তা সব যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতি না পেয়ে এক রকম মুষড়ে পড়েন। এই ব্যাচের মেধা তালিকার প্রথম ২৩ জনের মধ্যে ৯ জন বঞ্চিত হন। তাদের একজন কর্মকর্তা চাপা ক্ষোভ হতাশা থেকে যুগান্তরকে বলেন, ‘১৯৯৬ সালের ২০ আগস্ট আমার বড় আপন ভাই ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট রহমতুল বারী বিমান ক্রাশে সন্দ্বীপ চ্যানেলে শহীদ হন। ওইদিন আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিমান বাহিনীর সংবর্ধনা সভায় যোগ দিতে চট্টগ্রাম যাচ্ছিলেন। আমার ভাই এফ-৬ ফাইটার বিমান নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সংবর্ধনা সভায় যোগ দেয়ার জন্য রওনা হয়ে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় দুর্ঘটনার শিকার হন। সেদিন প্রধানমন্ত্রী খবর পেয়ে ওই অনুষ্ঠান বাতিল করেন এবং আমার বাবা-মাকে সান্ত্বনা দিতে আমাদের বাসায় যান। সেখানে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, দেশের জন্য আত্মত্যাগ কখনও বৃথা যাবে না। এই পরিবারকে আমি সারাজীবন দেখে রাখব। ওই সময়কার সব ছবি ও সংবাদ ডকুমেন্ট আমার কাছে আছে। কিন্তু চাকরি জীবনে কখনও সেটি ব্যবহার করে কোথাও কোনো সুবিধা নেইনি। কাউকে কোনোদিন বলিনি। বরং নিজের যোগ্যতা ও মেধা দিয়ে এ পর্যন্ত এসেছি।’ তিনি বলেন, ‘ব্যাচের মেধাতালিকার প্রথমদিকের কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও আমাকে এর আগে উপসচিব পদেও বঞ্চিত করা হয়।

 

অথচ আমার শিক্ষাগত যোগ্যতা, কাজের দক্ষতা এবং কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ কতগুলো ডিগ্রি ও পুরস্কার কোনো কিছুর মূল্যায়ন হল না।’ তিনি বলেন, ‘শুধু একটা আফসোস করি, প্রধানমন্ত্রী যদি জানতেন আমি সেই শহীদ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট রহমতুল বারীর ছোট বোন। তাহলে আমাকে কী কেউ পদোন্নতি থেকে বাদ দিতে পারতেন?’ লেফটআউটদের মধ্যে ১০ ব্যাচের একজন কর্মকর্তা ৭ জুন জনপ্রশাসন সচিবের কাছে যুগ্মসচিব পদে পদোন্নতি পুনঃবিবেচনা করতে লিখিত আবেদন জমা দেন। সেখানে তিনি এক স্থানে উল্লেখ করেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের সমর্থক ও আওয়ামী পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে আমাকে পদোন্নতি দেয়ার জন্য একাধিক সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী সুপারিশ করেছেন। তা সত্ত্বেও আমাকে পদোন্নতিবঞ্চিত করা হয়েছে। এর ফলে আমি পারিবারিক ও সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হচ্ছি।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এই বিভাগের আরও খবর