সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৪:২৫ অপরাহ্ন

ই-পেপার

পাহাড়ের ৩ জেলা পরিষদে তিন দশকেও নির্বাচন হয়নি

মোঃ নাজমুল হুদা, বান্দরবান প্রতিনিধি:
আপডেট সময়: সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ২:২৬ অপরাহ্ণ

তিন পার্বত্য জেলার জেলা পরিষদে ৩৬ বছর ধরে নির্বাচন হয়নি! ১৯৮৯ সালে প্রথম ও শেষ নির্বাচন হয়েছিল, এরপর আর কোনো নির্বাচন হয়নি। অনির্বাচিত দলীয় ব্যক্তিদের মাধ্যমে পরিষদগুলো পরিচালিত হচ্ছে, যার ফলে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি বেড়েছে।
দুর্নীতির মূল তিন খাত:
নিয়োগ-বদলি বাণিজ্য
খাদ্যশস্য বরাদ্দে অনিয়ম
ভুয়া উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থ লোপাট::
সাম্প্রতিক সময়ে দুদকের তদন্তে বেশ কয়েকজন সাবেক চেয়ারম্যান, সদস্য ও ঠিকাদারের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তবে, স্থানীয়রা বলছেন, নির্বাচন না হলে জবাবদিহি ফিরবে না।
বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ৩৬ বছর ধরে জেলা পরিষদ নির্বাচন হয়নি। পরিষদগুলো পরিচালিত হচ্ছে অনির্বাচিত দলীয় ব্যক্তিদের মাধ্যমে।
স্থানীয়রা বলছেন, জবাবদিহির অভাবে প্রতিষ্ঠানগুলোতে গড়ে উঠেছে দুর্নীতির সংস্কৃতি। এর ফলে সুষম উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছেন পাহাড়ের লাখো মানুষ।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি কিছুটা বদলাতে শুরু করেছে। দুদকের তদন্তে বেশ কয়েকজন সাবেক চেয়ারম্যান, সদস্য ও ঠিকাদারের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।
:- ৮৯’তে প্রথম আর শেষ নির্বাচন!
১৯৮৯ সালে অনুষ্ঠিত হয়েছিল পার্বত্য তিন জেলার প্রথম ও শেষ জেলা পরিষদ নির্বাচন। এরপর ৩৬ বছর কেটে গেলেও আর কোনো নির্বাচন হয়নি।এই সময়ের মধ্যে সরকার দলীয়ভাবে গঠিত ‘অন্তর্বর্তী পরিষদ’ দিয়েই চলছে প্রশাসন। প্রতিবছর শত কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন হয়। কিন্তু অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগে এই পরিষদগুলো নিয়ে জনঅসন্তোষ বাড়ছে।
:-ভোটে বাধা জেএসএস!
তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ পরিচালিত হয় বিশেষ আইন দ্বারা, যা দেশের ৬১ জেলা পরিষদ থেকে ভিন্ন।
১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বরে স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির আইনে সরকারের বিভিন্ন বিভাগ জেলা পরিষদের অধীন করা হয়েছে। চুক্তির আইনে ৫ বছর মেয়াদি জেলা পরিষদগুলোর নির্বাচনের কথা বলা আছে। এতে একজন চেয়ারম্যান ও ৩৩ জন সদস্য আনুপাতিকহারে নির্বাচিত হবেন। কিন্তু চুক্তির স্বাক্ষরকারী দল পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা নিয়ে আলাদা ভোটার তালিকা’ দাবি তুলে। এই সুযোগে বিগত সরকারগুলো কৌশলে নিজেদের দলীয় লোকদের দিয়ে বিভিন্ন আকারে ‘অন্তর্বর্তী পরিষদ’ গঠন করে আসছে।
:- দুর্নীতির মূল তিন খাত:
জেলা পরিষদে দুর্নীতি সবচেয়ে বেশি দেখা যায় তিনটি ক্ষেত্রে—নিয়োগ-বদলি বাণিজ্য, খাদ্যশস্য বরাদ্দে অনিয়ম এবং ভুয়া উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থ লোপাট।
কর্মচারী নিয়োগে ঘুষের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বছরের পর বছর খাদ্যশস্য প্রকল্প কাগজে খরচ দেখানো হলেও বাস্তবে তা জনগণের কাছে পৌঁছায় না।
দলীয় ঠিকাদাররা অস্তিত্বহীন প্রকল্প দেখিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করেন।
দুদকের অভিযানে বেরিয়ে এলো ‘থলের বিড়াল’
সম্প্রতি প্রথমবারের মতো রাঙামাটি জেলা পরিষদের সাবেক সদস্য, দুই প্রকৌশলী ও ঠিকাদারসহ নয়জনের বিরুদ্ধে চারটি মামলা হয়েছে। খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জিরুনা ত্রিপুরাকে স্থায়ীভাবে অপসারণ করা হয়েছে। বান্দরবানের চেয়ারম্যান ক্যশৈহল্লাসহ তিন জেলার আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধেও তদন্ত চলছে।
দুদকের উপপরিচালক মো. জাহিদ কালাম বলেন, অস্তিত্বহীন প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিযোগে চারটি মামলা হয়েছে। তদন্ত শেষে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে, মামলাগুলো আদালতে বিচারাধীন।
জনপ্রতিনিধির অভাবে একচেটিয়া প্রভাব
রাঙামাটি দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি ওমর ফারুক বলেন,নির্বাচন না হওয়ায় পরিষদে একচেটিয়া প্রভাব তৈরি হয়েছে। জনগণের কাছে জবাবদিহি না থাকায় দুর্নীতির সুযোগ বেড়েছে।
নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি জাহাঙ্গীর আলম মুন্না বলেন, মনোনীত চেয়ারম্যান ও সদস্যরা জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন। নির্বাচিত না হলে তাদের কাছ থেকে ভালো কিছু আশা করা যায় না।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট দীননাথ তঞ্চঙ্গা বলেন, নির্বাচনের মাধ্যমেই জেলা পরিষদে জবাবদিহি ফিরবে। বর্তমান কাঠামোয় তা সম্ভব নয়।
তিন পার্বত্য জেলার মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তারা বলেন,প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ভুলত্রুটি হওয়ার সুযোগ আছে। যাতে না হয়, আমরা সে বিষয়ে সতর্ক।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর পড়ুন
এক ক্লিকে বিভাগের খবর