বইয়ের প্রতি ভালোবাসা যেকোনো মানুষের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করে তোলে। কেউ ভালোবাসে গল্প পড়তে, কেউ বা কবিতা পড়তে। বইপ্রেমীদের কাছে বই একপ্রকার নেশার মত। রাজশাহীতে বইয়ের নেশা মেটাতে এক অনন্য সংযোজন ‘অংশু বুক ক্যাফে’।
একই ছাদের নিচে কফির চুমুকের সাথে বই পড়তে পারা,বইপ্রেমীদের এর চেয়ে সুখকর আর কি বা হতে পারে। এমনই একটি স্থান অংশু বুক ক্যাফে। লাইব্রেরীটি রাজশাহী মহানগরীর গণকপাড়া এলাকায় অবস্থিত। গ্রন্থাগারটির কার্যক্রম শুরু হয় ২০২২ সালের ১০ই জুন।
চারতলা বিল্ডিংয়ের দ্বিতীয় তলায় একই ফ্লোরের একপাশে গ্রন্থাগার, যেখানে রয়েছে বিভিন্ন প্রকাশনীর অসংখ্য বই। অপর পাশে রয়েছে ছোট একটি ক্যাফে। ক্যাফেতে কফির পাশাপাশি রয়েছে বিভিন্ন খাবার আইটেম।
গ্রন্থাগারটির সাজসজ্জাও নজর কাড়ছে এখানে আসা পাঠকদের। অংশুতে প্রবেশ করে দেখতে পাওয়া যায় একটি দৃষ্টিনন্দন দোলনা। বেশিরভাগ সময় দোলনাটির পাশে ভিড় জমে থাকে দোলনায় বসে ছবি তোলার জন্য।
গ্রন্থাগারটিতে বই কিনতে আসা সাদিয়া আফরিন জানান, ‘আমি বই পড়তে খুব ভালোবাসি। ছোটবেলা থেকেই একপ্রকার নেশার মত কাজ করে বই পড়া। পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি সবসময় গল্প, কবিতা, উপন্যাস পড়ি। অংশু শুরু হওয়ার পর থেকে প্রায়ই আসি এখানে। এখানে বসে যেমন বিনামূল্যে বই পড়া যায় তেমনি ন্যায্য দামে বই কেনাও যায়।’
আরেক পাঠক সারোয়ার আহম্মেদ জানান, ‘আমি অনেক বড় বইপ্রেমী না হলেও ভালো লাগে অবসর সময়ে বই পড়তে। অংশুর কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর বন্ধুদের সাথে প্রথমদিন এসে এখানের সংগ্রহ দেখে ভালো লাগে। এরপর থেকে সময় পেলে প্রায়ই বই পড়তে চলে আসি। আর এখানে গ্রুপভাবে বসার জায়গাও রয়েছে তাই বন্ধুদের সাথে একসাথে বসে কফি খেতে খেতে বই পড়তে পারি। এটা অনেক উপভোগ্য।’
অংশুর গ্রন্থাগারিক হুমায়রা ফেরদৌস জানান, গ্রন্থাগারটি প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে। যে কেউ এখানে এসে বই পড়তে এবং কিনতে পারেন।
এখানের বইগুলোর সংরক্ষণ সম্পর্কে তিনি জানান, ‘অন্যান্য গ্রন্থাগারের মত অংশুতেও বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে বই কিনে সংরক্ষণ করা হয়। আর কিছুদিনের মধ্যে ভারত থেকেও সেখানের লেখকদের প্রকাশিত অনেক বই আসবে।’
প্রতিষ্ঠাতা আসাদুজ্জামান জুয়েল অংশু প্রতিষ্ঠার পেছনের অনুপ্রেরণা সম্পর্কে জানান, ‘বই আমার কাছে নেশার মত। আমার নিজেরও ৩টি বই প্রকাশিত হয়েছে। আমি সবসময় ভাবতাম বইকে এমন ভাবে সবার সামনে উপস্থাপন করতে যেন একটা বই পড়তে বা কিনতে যেয়ে পাঠক আরো ১০টা বই সম্পর্কে জানতে পারে,সেগুলো পড়ার আগ্রহ জন্মে। আমাদের দেশের লাইব্রেরীগুলোর এমন অবস্থা যে পাঠক কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ঠিকমত বইয়ের পাতা উলটে দেখার সুযোগও পায় না।ধাক্কাধাক্কি, জায়গা,পরিবেশের কারণে। তাই আমি এমন একটি গ্রন্থাগার দেওয়ার স্বপ্ন দেখতাম যেখানে পাঠক ভালো পরিবেশে বসে বই পড়তে পারবে, কিনতে পারবে, একটি বই পড়তে এসে আরো বিভিন্ন বই সম্পর্কে জানবে। পাঠকের জানার,পড়ার আগ্রহ বাড়বে। সেই স্বপ্ন থেকে অংশুর যাত্রা শুরু।’
গ্রন্থাগারের পাশাপাশি ক্যাফের সংযোজন সম্পর্কে তিনি জানান, ‘এখানে সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত পাঠক বসে বই পড়তে পারবে। এই সময়ে তার খাবার খেতে,কফি পান করতে ইচ্ছা হলে তাকে বাইরে বের হতে হবে।এতে যেন বইয়ের আকর্ষণ বাঁধাগ্রস্ত না হয় তাই আমি গ্রন্থাগারের সাথে ক্যাফের সংযোজন করি। যেন পাঠকের বই পড়ার মাঝে উঠে বের হতে না হয়। একই স্থানে বইয়ের পাশাপাশি কফি, নাস্তা, দুপুরের বা রাতের খাবার সবই পাবে পাঠক। চাইলেই সকাল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত বই পড়তে পারবে। সবকিছুই এখানেই পাবে।’
গ্রন্থাগারের পাশাপাশি অংশু চ্যারিটির কাজও করে থাকে। বিভিন্ন সময়ে অসহায় ব্যক্তিদের কর্মসংস্থান, পূণর্বাসন, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার খরচ বহন, রাজশাহী সহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় নলকূপ স্থাপনের মত বিভিন্ন কার্যক্রম করে থাকে এই গ্রন্থাগারটি।
এ বিষয়ে আসাদুজ্জামান জানান, বই বিক্রয় থেকে আসা লভ্যাংশের কিছু অংশ চলে যায় বিভিন্ন অসহায়দের সাহায্যের কাজে। গ্রন্থাগারটির তার নিজস্ব হলেও চ্যারিটির এই কাজে তার সাথে যুক্ত রয়েছেন আরো কয়েকজন। তাছাড়া এ বছর শীতকালে গরীব-দুঃখীদের মাঝে ৫ হাজার কম্বল বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।