সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:০৩ অপরাহ্ন

দেশি মাছের সংকটে অস্তিত্বের লড়াই, ভাঙ্গুড়ার শুঁটকি শিল্পে দুর্দিন

চলনবিলের আলো ডেস্ক:
আপডেট সময়: সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬, ২:৪২ অপরাহ্ন

একসময় বর্ষা শেষে পাবনার ভাঙ্গুড়ার শুঁটকি চাতালগুলোতে শুরু হতো কর্মব্যস্ততা। নদী, খাল-বিল থেকে আসা দেশি মাছে ভরে উঠত চাতাল। মাছ পরিষ্কার, মাচায় শুকানো আর শুঁটকি প্রস্তুতের কাজে দিনভর ব্যস্ত থাকতেন শ্রমিকেরা। উৎপাদিত শুঁটকি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের চাহিদা মিটিয়ে পৌঁছে যেত বিদেশের বাজারেও। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই চিত্র পাল্টে গেছে। দেশি মাছের সংকট, জলাশয়ের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়া এবং নির্বিচারে মাছ শিকারের প্রভাবে এখন অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে ভাঙ্গুড়ার ঐতিহ্যবাহী শুঁটকি শিল্প।
উপজেলার অধিকাংশ শুঁটকি চাতাল বন্ধ হয়ে গেছে। যে একটি চাতাল চালু রয়েছে, সেখানেও চলছে সীমিত পরিসরে উৎপাদন। মাছের অভাবে কাজ পাচ্ছেন না শ্রমিকেরা, আর উৎপাদন কমে যাওয়ায় লোকসানের মুখে পড়ছেন ব্যবসায়ীরা। একসময়ের কর্মচঞ্চল শুঁটকি চাতালগুলো এখন হারাচ্ছে তাদের চিরচেনা আমেজ।
সম্প্রতি উপজেলার কলকতি এলাকার একটি শুঁটকি চাতালে গিয়ে দেখা যায়, সীমিত পরিমাণ মাছ নিয়ে শুকানোর কাজ করছেন শ্রমিকেরা। অন্যদিকে মাছের অভাবে অধিকাংশ চাতাল বন্ধ থাকায় কাজের সুযোগও কমে গেছে। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন দিনমজুর হিসেবে কাজ করা শ্রমিকেরা।

শ্রমিকদের মতোই অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন শুঁটকি ব্যবসায়ীরা। মাছ সংগ্রহ করতে না পারায় অনেককে চাতাল বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এতে একদিকে ব্যবসায়িক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে, অন্যদিকে কমেছে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ।
শুঁটকি ব্যবসায়ী রইচ উদ্দিন জানান, আগে নিয়মিত মাছ পাওয়া গেলেও চলতি মৌসুমে অনেক ব্যবসায়ী টানা দুই সপ্তাহেও মাছ পাননি। ফলে বাধ্য হয়ে অনেকে চাতাল বন্ধ রেখেছেন। তাঁর মতে, চলনবিল এলাকায় অপরিকল্পিত পুকুর খনন, অবৈধ জাল ব্যবহার ও নির্বিচারে মাছ শিকারের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা আছান আলী ও সুজন শেখসহ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একসময় বর্ষা মৌসুমে চলনবিলসহ ভাঙ্গুড়ার ছোট-বড় বিল পানিতে টইটম্বুর থাকত। নদী ও খাল দিয়ে মাছ চলাচল করত বিভিন্ন জলাশয়ে। স্থানীয় জেলেরা এসব জলাশয় থেকে প্রচুর দেশি মাছ আহরণ করতেন। সেই মাছের একটি বড় অংশ সরবরাহ করা হতো শুঁটকি চাতালগুলোতে।
তাঁরা জানান, একসময় ভাঙ্গুড়ার শুঁটকির সুনাম ছিল দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। স্থানীয়দের দাবি, দেশের চাহিদা মিটিয়ে এই শুঁটকি বিদেশের অন্তত ২০টি দেশে রপ্তানি হতো। কিন্তু জলাশয়ে পানি কমে যাওয়া ও দেশি মাছের প্রাপ্যতা কমে আসায় সেই জমজমাট ব্যবসায় এখন ভাটা পড়েছে। আগের মতো মাছ না পাওয়ায় উৎপাদন ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠেছে।

শুঁটকি চাতালের শ্রমিক আসমা খাতুন বলেন, “আগে চাতালে কাজের অভাব ছিল না। প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা আয় হতো। এখন মাছ না থাকায় অধিকাংশ দিন কাজই থাকে না। সংসার চালানো কষ্ট হয়ে গেছে।”

স্থানীয়দের মতে, নদী, খাল ও বিলের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়া দেশি মাছ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ। অপরিকল্পিত বাঁধ, সড়ক ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের ফলে অনেক জলাশয়ের পানি ধারণক্ষমতা কমেছে। কোথাও কোথাও বর্ষা মৌসুমেও বিলগুলো পর্যাপ্ত পানিতে পূর্ণ হচ্ছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চায়না দুয়ারি, বাদাই জালসহ বিভিন্ন নিষিদ্ধ ও ক্ষতিকর জালের ব্যবহার।
এসব জালে মা মাছের পাশাপাশি রেণু ও পোনা মাছও ধরা পড়ছে। ফলে মাছের প্রজনন ও বংশবিস্তার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের আশঙ্কা, জলাশয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এবং অবৈধ মাছ শিকার বন্ধ করা না গেলে দেশি মাছের সংকট আরও বাড়তে পারে।

ভাঙ্গুড়া উপজেলার কলকতি এলাকার শুঁটকি চাতালের মালিক মো. দুলাল হোসেন বলেন, “দিলপাশার, পুইবিল, আদাবাড়িয়া, বাশবাড়িয়া ও দত্তখারুয়া বিলে একসময় প্রচুর দেশি মাছ পাওয়া যেত। এখন চায়না দুয়ারি জাল দিয়ে মা মাছসহ সব ধ্বংস করা হচ্ছে। এতে দেশি মাছের উৎপাদন ও প্রজনন মারাত্মকভাবে কমে গেছে। শুঁটকি উৎপাদন ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।”
দুলাল হোসেনের ভাষ্য, দেশি মাছের সরবরাহ কমে যাওয়ায় চাতাল চালু রাখা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। পর্যাপ্ত মাছ পাওয়া না গেলে শ্রমিকদের কাজ দেওয়া এবং ব্যবসার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী শুঁটকি শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
একসময় ভাঙ্গুড়া ও চলনবিল অঞ্চলের মুক্ত জলাশয়ে পাওয়া যেত দেশি মাছের বিপুল বৈচিত্র্য। মাগুর, চাপিলা, শিং, পাবদা, টাকি, চিতল, রিটা, গুজি, আইড়, কৈ, বোয়াল, খৈলসা, দেশি সরপুঁটি, গজার, বাইম, টাটকিনি, তিতপুঁটি, বাঘাইড়, গুলশা, কাজলি, গাং চেলা, টেংরা, মলা, কালোবাউশ ও শোলসহ নানা প্রজাতির মাছ ছিল স্থানীয় মানুষের খাদ্য ও জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
কিন্তু এখন এসব মাছের অনেক প্রজাতি আগের মতো সহজে পাওয়া যায় না। স্থানীয় বাজারগুলোতেও দেশি মাছের সরবরাহ কমেছে। চাষের মাছের উপস্থিতি থাকলেও প্রাকৃতিক জলাশয়ের দেশি মাছের সংকট স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আর দেশি মাছের ওপর নির্ভরশীল শুঁটকি শিল্পে পড়েছে এর সরাসরি প্রভাব।

এ বিষয়ে ভাঙ্গুড়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আরিফুল মোল্লা বলেন, “চায়না দুয়ারিসহ বিভিন্ন নিষিদ্ধ জালে নির্বিচারে মাছ নিধন এবং বৃষ্টি কম হওয়ায় জলাশয়ে পানি ও মাছ দুটোই কমেছে। অন্যান্য বছর যেখানে তিনটি শুঁটকি চাতাল ছিল, সেখানে এবার রয়েছে মাত্র একটি। গত বছর ৭ টন শুঁটকি উৎপাদন হলেও এ বছর ৪ থেকে ৫ টন উৎপাদন করাও কঠিন।”
তিনি আরও বলেন, দেশি ও বিদেশি বাজারে শুঁটকির চাহিদা থাকলেও জলাশয়ে পর্যাপ্ত মাছ না থাকলে এ শিল্প টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। মাছের প্রজনন ও উৎপাদন বাড়াতে নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধ করা, জলাশয়ের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা এবং মৎস্যজীবীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
মৎস্য কর্মকর্তা জানান, চলতি বছর নিষিদ্ধ জালের বিরুদ্ধে ১৬টি অভিযান পরিচালনা করে ৭০৩টি নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি জাল ধ্বংস করা হয়েছে। নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধে নিয়মিত অভিযান ও আইন প্রয়োগ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।


আপনার মতামত লিখুন :
এই বিভাগের আরও খবর পড়ুন
এক ক্লিকে বিভাগের খবর