শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬, ১১:২৭ পূর্বাহ্ন

কোরআন-সুন্নাহ থেকে দূরত্বই কি অশান্তির মূল কারণ?- মুফতি মাওলানা: শামীম আহমেদ

চলনবিলের আলো ডেস্ক:
আপডেট সময়: শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬, ১০:৪২ অপরাহ্ন

মানুষ আজ বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও আধুনিকতার নানা ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব উন্নতি করেছে। কিন্তু এত উন্নতির পরও ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে অশান্তি যেন দিন দিন বেড়েই চলেছে। মানুষের মধ্যে হিংসা, বিদ্বেষ, প্রতারণা, অন্যায়, জুলুম, পরশ্রীকাতরতা ও স্বার্থপরতা বাড়ছে। প্রশ্ন হলো—এই অশান্তির মূল কারণ কোথায়? কোরআন ও সুন্নাহ থেকে আমাদের দূরত্বই কি এর অন্যতম প্রধান কারণ?
পবিত্র কোরআন মানুষের জন্য শুধু একটি ধর্মগ্রন্থ নয়; এটি জীবন পরিচালনার পূর্ণাঙ্গ পথনির্দেশ। মহান আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই এই কোরআন এমন পথের নির্দেশনা দেয়, যা সবচেয়ে সঠিক।” (সুরা আল-ইসরা: ৯)
অর্থাৎ মানুষের ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের ন্যায়-নীতি ও মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় কোরআনের নির্দেশনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ যখন আল্লাহর বিধানকে উপেক্ষা করে নিজের প্রবৃত্তি ও স্বার্থকে জীবনের নিয়ামক বানিয়ে নেয়, তখন অন্যায় ও বিশৃঙ্খলার পথ প্রশস্ত হয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ হলো কোরআনের বাস্তব প্রয়োগের জীবন্ত দৃষ্টান্ত। তিনি মানুষের সঙ্গে কেমন আচরণ করতে হবে, প্রতিবেশীর অধিকার কী, দুর্বল ও অসহায়ের প্রতি কেমন হতে হবে, ব্যবসা-বাণিজ্যে সততা কীভাবে বজায় রাখতে হবে—এসব বিষয়ে বাস্তব শিক্ষা দিয়েছেন।
আজ অনেক ক্ষেত্রে আমরা ধর্মকে শুধু ব্যক্তিগত কিছু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছি। নামাজ পড়ছি, কিন্তু মানুষের অধিকার নষ্ট করছি; রোজা রাখছি, অথচ মিথ্যা ও প্রতারণা ছাড়ছি না; ধর্মীয় কথা বলছি, কিন্তু আচরণে তার প্রতিফলন নেই। অথচ ইসলাম মানুষের চরিত্র ও কর্মকে সুন্দর করার শিক্ষা দেয়।
মহান আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সৎকর্ম ও আত্মীয়স্বজনকে দান করার নির্দেশ দেন এবং অশ্লীলতা, অসৎকর্ম ও সীমালঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেন।” (সুরা আন-নাহল: ৯০)
এই আয়াতের শিক্ষা যদি ব্যক্তি ও সমাজজীবনে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে অন্যায়-অবিচার, দুর্নীতি, জুলুম ও মানুষের অধিকার হরণের প্রবণতা অনেকটাই কমে আসতে পারে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে উত্তম সেই ব্যক্তি, যার চরিত্র উত্তম।” (সহিহ বুখারি)
সুতরাং ইসলাম শুধু ইবাদতের শিক্ষা দেয় না; ইসলাম সুন্দর চরিত্র, ন্যায়বিচার, মানবিকতা, ক্ষমা, ধৈর্য ও পারস্পরিক ভালোবাসার শিক্ষা দেয়। কোরআন-সুন্নাহর শিক্ষা ব্যক্তি জীবনে যত বেশি বাস্তবায়িত হবে, মানুষের চরিত্র তত বেশি সুন্দর হবে এবং সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ তত সহজ হবে।
আজ পরিবারে অশান্তি, সমাজে বিভেদ, মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস ও হিংসা—এসব থেকে মুক্তির জন্য আমাদের নতুন করে কোরআন ও সুন্নাহর দিকে ফিরে তাকাতে হবে। সন্তানদের শুধু পার্থিব শিক্ষায় শিক্ষিত করলেই হবে না; তাদের আল্লাহভীতি, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষাও দিতে হবে।
তবে কোরআন-সুন্নাহর দিকে ফিরে যাওয়া মানে শুধু মুখে ধর্মীয় কথা বলা নয়। এর অর্থ হলো—আল্লাহর বিধানকে সম্মান করা, রাসুল (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণ করা এবং নিজের চরিত্র ও কর্মে ইসলামের শিক্ষা বাস্তবায়ন করা।
অশান্তির অন্ধকার থেকে শান্তির পথে ফিরতে হলে আমাদের প্রত্যেকের আত্মসমালোচনা প্রয়োজন। আমরা যদি কোরআনের শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করি, সুন্নাহর আদর্শ জীবনে অনুসরণ করি এবং মানুষের অধিকার রক্ষায় সচেতন হই, তাহলে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে শান্তি প্রতিষ্ঠার পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
তাই প্রশ্নটি আমাদের নিজেদের কাছেই—অশান্তির কারণ খুঁজতে গিয়ে আমরা কি কোরআন-সুন্নাহ থেকে নিজেদের দূরত্বের বিষয়টি একবার গভীরভাবে ভেবে দেখেছি?


আপনার মতামত লিখুন :
এই বিভাগের আরও খবর পড়ুন
এক ক্লিকে বিভাগের খবর