শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬, ১২:২১ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
শিরোনাম :
চাটমোহরে মাদকবিরোধী অভিযান: ১৭ পিস ইয়াবাসহ যুবক গ্রেপ্তার খেলাধূলা হতে পারে পরিবার ও সমাজে সম্প্রীতির সেতুবন্ধন- নিকোলাস বিশ্বাস রাণীনগরে দুর্নীতি বিরোধী বিতর্ক প্রতিযোগিতা আটোয়ারীতে জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন উপলক্ষে অবহিতকরণ ও পরিকল্পনা সভা রডমিস্ত্রিকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা প্রতিবাদে গোপালপুরে মানববন্ধন আটঘরিয়ার একদন্ত উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মকবুল হোসেন সন্ত্রাসীদের হাতে লাঞ্ছিত হওয়ার প্রতিবাদে মানববন্ধন নাগরপুরে গোপিনাথপুর মরা নদী পর্যন্ত রাস্তা নয়, যেন মরণফাঁদ গোপালপুরে নির্মাণ শ্রমিক বেলাল হত্যার বিচারের দাবিতে শ্রমিক ইউনিয়নের মানববন্ধন

মুহাররম ও আশুরা’র ফযীলত,আমল,করণীয়-বর্জনীয় ও ঐতিহাসিক শিক্ষা – মুফতি মাওলানা: শামীম আহমেদ

চলনবিলের আলো ডেস্ক:
আপডেট সময়: শুক্রবার, ২৬ জুন, ২০২৬, ২:২৯ অপরাহ্ন

জিলহজ্জ মাসের বিদায় এবং মুহাররম মাসের আগমনে একটি বছরের পরিসমাপ্তি ও নতুন বছরের সূচনা হয়। চাঁদ ও দিনের আবর্তন জ্ঞানীদের জন্য শিক্ষণীয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ فِي اخْتِلَافِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ وَمَا خَلَقَ اللهُ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ لَآيَاتٍ لِقَوْمٍ يَتَّقُونَ
(সূরা ইউনুস, ১০:৬)
বুদ্ধিমান তারাই, যারা জীবনের মূল্যবান সময়কে পরকালের পাথেয় সংগ্রহে কাজে লাগায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
كُلُّ النَّاسِ يَغْدُو فَبَايِعٌ نَفْسَهُ فَمُعْتِقُهَا أَوْ مُوبِقُهَا
(সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২২৩)
একজন মুমিনের কর্তব্য হলো প্রতিটি নতুন সূচনায় কল্যাণের দিকে ধাবিত হওয়ার প্রত্যয় গ্রহণ করা।
মুহাররমের গুরুত্ব ও আমল:
মুহাররম হিজরি বর্ষের প্রথম এবং “শাহরুল্লাহ আল-মুহাররম”, তথা আল্লাহর মাস। আল্লাহ তাআলা বলেন:
اِنَّ عِدَّةَ الشُّهُوْرِ عِنْدَ اللهِ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا فِیْ كِتٰبِ اللهِ یَوْمَ خَلَقَ السَّمٰوٰتِ وَالْاَرْضَ مِنْهَاۤ اَرْبَعَةٌ حُرُمٌ ۚ ذٰلِكَ الدِّیْنُ الْقَیِّمُ فَلَا تَظْلِمُوْا فِیْهِنَّ اَنْفُسَكُم
(সূরা তাওবা, ৯:৩৬)
সম্মানিত চারটি মাসের মধ্যে মুহাররম অন্যতম। নবী কারীম ﷺ বলেন:
“রমজানের পর সবচেয়ে উত্তম রোজা হলো আল্লাহর মাস মুহাররমের রোজা।”
(সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১১৬৩)
মুসলিমদের দ্বীনি বিষয়াদি চান্দ্র হিসাবের ওপর নির্ভরশীল। তাই হিজরি সনের প্রতি যত্নবান হওয়া মুমিনের জন্য কাম্য। নতুন চাঁদ দেখে রাসূলুল্লাহ ﷺ—
اللَّهُمَّ أَهِلَّهُ عَلَيْنَا بِالْيُمْنِ وَالْإِيمَانِ وَالسَّلَامَةِ وَالْإِسْلَامِ، رَبِّي وَرَبُّكَ اللهُ
(জামে তিরমিযী, হাদীস: ৩৪৫১)
দু’আ পড়তেন। সাহাবায়ে কেরাম নতুন বছর শুরুর এ দু’আটিকেও গুরুত্ব দিতেন:
اللَّهُمَّ أَدْخِلْهُ عَلَيْنَا بِالْأَمْنِ وَالْإِيمَانِ وَالسَّلَامَةِ وَالْإِسْلَامِ وَجِوَارٍ مِنَ الشَّيْطَانِ وَرِضْوَانٍ مِنَ الرَّحْمٰنِ
(মু‘জামুস সাহাবা, ৩/৫৪৩)
আশুরার গুরুত্ব ও আমল:
‘আশুরা’ শব্দটি আরবি সংখ্যা ‘আশারা’ (عشرة) থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘দশ’। এই মূল ধাতু থেকে ‘আশুরা’ অর্থ দাঁড়ায় ‘দশম’। ইসলামি পরিভাষায় ‘আশুরা’ বলতে হিজরি সনের প্রথম মাস মুহাররমের দশম তারিখকে বোঝানো হয়। এই দিনটি মুসলিম বিশ্বে ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক—উভয় দিক থেকেই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
মুহাররমের সবচেয়ে মহিমান্বিত দিন ‘ইয়াওমে আশুরা’—১০ই মুহাররম। এর রোজা পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহের কাফফারাহ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
صِيَامُ يَوْمِ عَاشُورَاءَ أَحْتَسِبُ عَلَى اللهِ أَنْ يُكَفِّرَ السَّنَةَ الَّتِي قَبْلَهُ
(সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১১৬২)
এই দিনে আল্লাহ মূসা (আ.) ও তাঁর কওমকে ফিরআউনের কবল থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। ইহুদিদের সঙ্গে সাদৃশ্য পরিহারের জন্য রাসূলুল্লাহ ﷺ ১০ তারিখের সঙ্গে ৯ তারিখ রোজা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন:
لَئِنْ بَقِيتُ إِلَى قَابِلٍ لَأَصُومَنَّ التَّاسِعَ
(সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১১৩৪)
ইবনে আব্বাস (রা.) বলতেন:
صُومُوا التَّاسِعَ وَالْعَاشِرَ وَخَالِفُوا الْيَهُودَ
(জামে তিরমিযী, হাদীস: ৭৫৫)
আশুরার রোজার নিয়ম:
ইহুদিদের সঙ্গে সাদৃশ্য পরিহার করার জন্য রাসূলুল্লাহ ﷺ আশুরার রোজার সঙ্গে আরও একদিন রোজা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। মুহাররমের ৯ তারিখ ও ১০ তারিখ রোজা রাখা উত্তম। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“যদি আমি আগামী বছর জীবিত থাকি, তাহলে অবশ্যই নয় তারিখেও রোজা রাখব।” (সহীহ মুসলিম)
যদি ৯ তারিখে রোজা রাখা সম্ভব না হয়, তাহলে ১০ তারিখ ও ১১ তারিখ রোজা রাখা যেতে পারে। শুধু ১০ মুহাররম—একান্তই যদি দুটি রোজা রাখা সম্ভব না হয়, তাহলে শুধু ১০ তারিখের রোজা রাখলেও এর ফজিলত লাভ করা যাবে। তবে উত্তম হলো ৯, ১০ ও ১১ মুহাররম—মোট তিনটি রোজা রাখা।
আশুরার করণীয়:
মুহাররম, বিশেষ করে আশুরা, তাওবা-ইস্তিগফারের জন্য অনুকূল সময়। হাদীসে আছে, এই দিনে আল্লাহ অনেকের তাওবা কবুল করেছেন এবং ভবিষ্যতেও করবেন। (জামে তিরমিযী, হাদীস: ৭৪১)
সায়্যেদুল ইস্তিগফার হলো তাওবার শ্রেষ্ঠ দু’আ:
اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّي لَا إِلٰهَ إِلَّا أَنْتَ، خَلَقْتَنِي وَأَنَا عَبْدُكَ، وَأَنَا عَلَى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ، أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ، أَبُوءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَيَّ، وَأَبُوءُ بِذَنْبِي، فَاغْفِرْ لِي، فَإِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ
(সহীহ বুখারী, হাদীস: ৬৩০৬)
আমরা আশুরার রোজা রাখার পাশাপাশি বেশি বেশি দান-সদকা, তিলাওয়াত এবং দোয়া-মোনাজাত করতে পারি।
আশুরার বর্জনীয়:
আশুরার যেমন অনেক গুরুত্ব রয়েছে, তেমনি এর অসম্মান করলেও বহু অকল্যাণের আশঙ্কা আছে। আফসোসের বিষয়, এই ফজিলতের মাসকে ঘিরে সমাজে মাতম, তাজিয়া এবং নানা রকমের বিদআতি কর্মকাণ্ড প্রচলিত আছে, যা ইসলামে সম্পূর্ণ নাজায়েজ। আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
فَلَا تَظْلِمُوْا فِیْهِنَّ اَنْفُسَكُم
(সূরা তাওবা, ৯:৩৬)
অতএব, সকল গর্হিত ও বিদআতি কার্যকলাপ থেকে বেঁচে থেকে শরিয়ত-নির্দেশিত আমলগুলোতে মনোযোগী হওয়া মুমিনের জন্য আবশ্যক।
আশুরার প্রসিদ্ধ ঘটনাবলি:
আশুরা, অর্থাৎ মুহাররম মাসের দশম দিন, ইসলামের ইতিহাসে বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী। তবে এর মধ্যে কিছু ঘটনা সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত, আর কিছু ঘটনা সমাজে প্রচলিত হলেও সেগুলোর বিশুদ্ধ ভিত্তি নেই; তবে বিভিন্ন তাফসির ও ইতিহাসের কিতাবে এসব ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়। এখানে প্রসিদ্ধ ঘটনাবলি উল্লেখ করা হলো:
১. সৃষ্টি ও কিয়ামত:
আল্লাহ তাআলা এই দিনে পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁর ইচ্ছায় এই দিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে।
২. আদম (আ.)-এর ঘটনাবলি:
মানবজাতির পিতা হজরত আদম (আ.)-কে এই দিনে জান্নাত থেকে পৃথিবীতে পাঠানো হয়। এই দিনেই আল্লাহ তাআলা আদম (আ.)-এর দোয়া কবুল করেন। এছাড়াও এই দিনে মানবজাতির মা হাওয়া (আ.)-এর সঙ্গে আরাফার ময়দানে পৃথিবীতে প্রথম সাক্ষাৎ হয় আদম (আ.)-এর।
৩. নূহ (আ.)-এর মহাপ্লাবন থেকে মুক্তি:
আল্লাহর নবী নূহ (আ.)-এর জাতি আল্লাহর অবাধ্য হওয়ায় মহাপ্লাবনে নিপতিত হয়েছিল। দীর্ঘ প্লাবন শেষে মহাররমের ১০ তারিখে তিনি নৌকা থেকে ঈমানদারদের নিয়ে পৃথিবীতে নেমে আসেন।
৪. ইবরাহিম (আ.)-এর অগ্নিকুণ্ড থেকে মুক্তি:
আল্লাহর প্রিয়নবী হজরত ইবরাহিম (আ.)-কে অত্যাচারী বাদশাহ নমরুদ অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করেছিল। তিনি অগ্নিকুণ্ডে ৪০ দিন থাকার পর মহাররমের ১০ তারিখ মুক্তি লাভ করেন।
৫. আইয়ুব (আ.)-এর রোগমুক্তি:
আল্লাহর নবী আইয়ুব (আ.) ১৮ বছর কঠিন রোগে আক্রান্ত ছিলেন। তিনি এই দিনে মহান আল্লাহর রহমতে পূর্ণ সুস্থতা ও সুস্বাস্থ্য লাভ করেন।
৬. ইউসুফ (আ.)-এর পিতার সঙ্গে সাক্ষাৎ:
হজরত ইউসুফ (আ.)-কে তাঁর ১১ ভাই ষড়যন্ত্র করে কূপে ফেলে দেয়। পরে তিনি ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি হয়ে মিশরের প্রধানমন্ত্রীর পদ লাভ করেন। এরপর ১০ মহাররম দীর্ঘ ৪০ বছর পর তিনি পিতা ইয়াকুব (আ.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
৭. ইউনুস (আ.)-এর মাছের পেট থেকে মুক্তি:
আল্লাহর আরেক নবী হজরত ইউনুস (আ.) জাতির লোকদের প্রতি হতাশ হয়ে দেশত্যাগ করতে চাইলে একটি বড় মাছ তাঁকে গিলে ফেলে। মাছের পেটে তিনি ৪০ দিন থাকার পর ১০ মহাররম আল্লাহর রহমতে নদীর তীরে মুক্তি লাভ করেন।
৮. মূসা (আ.) ও ফিরআউনের ধ্বংস:
বনি ইসরাইলের নবী হজরত মূসা (আ.) ফিরআউনের জুলুম থেকে বাঁচতে সঙ্গী-অনুসারীসহ নীল নদ পার হয়ে নিরাপদে পৌঁছান। আর অত্যাচারী ফিরআউন তার দলবলসহ নদীর পানিতে ডুবে মারা যায়।
৯. ঈসা (আ.)-এর আসমানে উত্তোলন:
ঈসা (আ.)-কে তাঁর জাতির লোকেরা হত্যা করার চেষ্টা করলে মহাররমের ১০ তারিখ মহান আল্লাহ তাঁকে আসমানে উঠিয়ে নেন।
১০. কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা:
মুহাররম মাসের ১০ তারিখে আল্লাহর নবী ﷺ-এর প্রিয় নাতি হজরত ইমাম হুসাইন (রা.) কারবালা প্রান্তরে শাহাদাত বরণ করেন। এটি ইসলামের ইতিহাসে একটি গভীর শোকের দিন।
১১. শাহ মুহাম্মদ মুহিব্বুল্লাহ (রহ.)-এর ইন্তিকাল:
উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ আধ্যাত্মিক দরবার শরীফ ছারছীনার পীরে কামেল, মুজাদ্দিদে জামান, শাহ সূফী হজরত মাওলানা শাহ মুহাম্মদ মুহিব্বুল্লাহ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি ১৪৪৬ হিজরি সনের মুহাররম মাসের ১০ তারিখ, তথা আশুরার দিন, পার্থিব জগতের সংশ্রব ত্যাগ করে অসংখ্য ভক্ত-মুরিদানকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে রফিকে আ’লার ডাকে সাড়া দেন। “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।”
আল্লাহ তাআলা তাঁকে জান্নাতের উচ্চ মাকাম দান করুন, তাঁর মর্যাদা বুলন্দ করে দিন এবং তাঁর আদর্শ ধারণ করে আমাদেরকে হকের পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।
শেষ কথা: উপরে উল্লিখিত ঘটনাগুলোর মধ্যে মূসা (আ.) ও ফিরআউনের ঘটনা এবং ইমাম হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাত ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে অধিক নির্ভরযোগ্য। অন্য অনেক ঘটনার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট ও বিশুদ্ধ হাদীসের প্রমাণ নেই; তবে বিভিন্ন তাফসির ও ইতিহাসের কিতাবে এগুলোর উল্লেখ পাওয়া যায়।
তবে আশুরার মূল আমল হলো রোজা রাখা, যা পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহের কাফফারাহ।
বাংলাদেশে ২০২৬ সালে আশুরা ২৬/০৬/২০২৬ ইং, রোজ শুক্রবার। তাই আশুরা উপলক্ষে বৃহস্পতি, শুক্রবার ও শনিবার—এই তিন দিন রোজা রাখা যাবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর পড়ুন
এক ক্লিকে বিভাগের খবর