বোরো মৌসুমে কৃষি শ্রমিক সংকট চরমে, দেড় হাজার টাকার ওপরে উঠেছে দৈনিক মজুরি, দিশেহারা কৃষক, তবু ভরসা এই ‘কামলার হাট।
ভোরের আলো ফোটার আগেই জমে ওঠে হাট। চারপাশে ভিড়, দরদাম, হাঁকডাক, তবে এখানে বিক্রি হয় না কোনো পণ্য, বিক্রি হয় মানুষের শ্রম। নাম মানুষ বিক্রির হাট, তবে স্থানীয়দের কাছে এটি পরিচিত ‘কামলার হাট’ হিসেবে।
যশোরের অভয়নগর উপজেলার নূরবাগ রেলক্রসিং সংলগ্ন এলাকায় প্রতিদিন ভোর থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত চলে এই ব্যতিক্রমী হাট। প্রথম শুনলে বিস্ময় জাগলেও, বাস্তবে এটি শ্রমবাজার, যেখানে কৃষি শ্রমিকরা দিনের কয়েক ঘণ্টার জন্য নিজেদের শ্রম বিক্রি করেন। চলতি বোরো মৌসুমে এই হাটে শ্রমিকদের চাহিদা বেড়েছে ব্যাপকভাবে। ফলে মজুরিও উঠেছে আকাশচুম্বী। যেখানে অন্য সময় ৫০০ টাকায় শ্রম পাওয়া যেত, সেখানে এখন একজন শ্রমিকের দাম উঠেছে ১৪০০ থেকে ১৮০০ টাকা পর্যন্ত। চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে আসা শ্রমিক আব্দুল কাদের জানান, সকাল ৬টা থেকে কাজের জন্য দাঁড়িয়ে আছি। ধান বয়ে আনার জন্য ১৬০০ টাকা চাইছি। মৌসুম বলেই এখন দাম বেশি। এই হাটে আসা অধিকাংশ শ্রমিক রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চল থেকে আসেন। তারা ধান কাটা, বাঁধা, বহন, ঝাড়াই থেকে শুরু করে বিচালী গাদা দেওয়ার মতো কাজ করেন। অন্যদিকে, শ্রমিকের এই উচ্চমূল্যে চরম চাপে পড়েছেন কৃষকেরা। উপজেলার পায়রা এলাকার কৃষক আলাউদ্দীন বলেন, এক বিঘা জমির ধান তুলতে ২০ জন শ্রমিক নিয়েছি। জনপ্রতি ১৪০০ টাকা করে দিতে হচ্ছে। সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত কাজ করবে। ধান চাষি সফিয়ার গাজী জানান, দুই বিঘা জমির জন্য শ্রমিক নিতে এসে দেখি ১৫০০ টাকা চাইছে। দু’দিন আগেও ১৭০০-১৮০০ টাকা ছিল। এখন তিনগুণ খরচে কাজ করাতে হচ্ছে।
কৃষক মফিজুর রহমানের কণ্ঠে হতাশা স্পষ্ট, ধানের দাম মণপ্রতি ১০০০-১১০০ টাকা। এই দামে বিক্রি করে এত বেশি মজুরি দিলে আমরা বাঁচবো কীভাবে? এভাবে চললে ধান চাষ বন্ধ করতে হবে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা লাভলী খাতুন জানান, এবার অভয়নগরে বোরো ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৪ হাজার ৩৭৫ হেক্টর। ইতোমধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে।
তিনি বলেন, ধান কাটার মৌসুমে শ্রমিকের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় মজুরি বেড়েছে। কয়েক দিনের মধ্যেই কৃষকেরা তাদের ধান ঘরে তুলতে পারবেন।
এই মানুষ বিক্রির হাট আসলে বেঁচে থাকার সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। এখানে কেউ চিরদিনের জন্য বিক্রি হন না, শুধু কয়েক ঘণ্টার শ্রম দিয়ে পরিবার চালানোর জন্যই নিজেদের ‘বিক্রি’ করেন।
কৃষক আর শ্রমিক, দুই পক্ষই এই হাটে নির্ভরশীল। একজন খোঁজেন কাজ, অন্যজন শ্রম। তবে দামের এই অস্থিরতায় দু’পক্ষই এখন চাপে। অভয়নগরের এই হাট শুধু একটি শ্রমবাজার নয়, এটি গ্রামীণ অর্থনীতির বাস্তব চিত্র। যেখানে একদিকে শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, অন্যদিকে কৃষকের টিকে থাকার লড়াই, দুটোই সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।