রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০৮ পূর্বাহ্ন

ভিন্ন ধর্ম মানেই শত্রু নয়! কোরআনের তিনটি আয়াতেই রয়েছে স্পষ্ট জবাব- সাইদুজ্জামান সাগর

চলনবিলের আলো ডেস্ক:
আপডেট সময়: শনিবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৬, ১০:০৮ অপরাহ্ন

‘কাফের দেখলেই হত্যা করো!’—ইসলাম সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণা ও অপপ্রচারের মধ্যে এটি অন্যতম।

অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, অনেকে কোরআনের সামগ্রিক শিক্ষা ও আয়াতের প্রেক্ষাপট না বুঝেই এমন বক্তব্য প্রচার করেন। কেউ কেউ আবার বিচ্ছিন্ন কিছু আয়াতের আংশিক উদ্ধৃতি দিয়ে ইসলামের মানবিক শিক্ষাকে আড়াল করার চেষ্টা করেন।

অথচ বিষয়টি বুঝতে পবিত্র কোরআনের মাত্র তিনটি আয়াতের দিকে মনোযোগ দিলেই হয়।

আয়াত তিনটি হলো—সূরা আল-বাকারা ২৫৬ এবং সূরা আল-মুমতাহিনা ৮ ও ৯।

চলুন, আয়াতগুলোর বক্তব্য একটু মনোযোগ দিয়ে দেখি।

প্রথম আয়াত: ধর্ম গ্রহণে কোনো জবরদস্তি নেই
সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২৫৬

আল্লাহ বলেন—

“দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই। নিশ্চয়ই হিদায়াত ভ্রান্তি থেকে সুস্পষ্ট হয়ে গেছে।”

কত চমৎকার একটি ঘোষণা!

ইসলাম নিজেই ঘোষণা করছে, ধর্মের ব্যাপারে জোরজবরদস্তির কোনো স্থান নেই।

অর্থাৎ কাউকে ভয় দেখিয়ে, চাপ প্রয়োগ করে কিংবা জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করা ইসলামের মৌলিক শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

একজন মানুষ কোন ধর্ম অনুসরণ করবেন, সেটি তাঁর বিশ্বাস ও বিবেকের বিষয়। বিশ্বাসের জায়গায় জবরদস্তি দিয়ে প্রকৃত ধর্মীয় উপলব্ধি তৈরি করা সম্ভব নয়।

দ্বিতীয় আয়াত: ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি সদাচরণ ও ন্যায়বিচার
সূরা আল-মুমতাহিনা, আয়াত ৮

আল্লাহ বলেন—

“দীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে তোমাদের ঘরবাড়ি থেকে বের করে দেয়নি, তাদের প্রতি সদাচরণ করতে ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না। নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচারকারীদের ভালোবাসেন।”

এই আয়াতের বক্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

এখানে শুধু ভালো ব্যবহার বা সৌজন্য প্রদর্শনের কথা বলা হয়নি; পাশাপাশি ন্যায়বিচারের কথাও বলা হয়েছে।

অর্থাৎ একজন অমুসলিম ব্যক্তি শুধু ভিন্ন ধর্মের অনুসারী হওয়ার কারণে অসম্মান, অবিচার কিংবা বৈষম্যের শিকার হবেন—ইসলাম এমন শিক্ষা দেয় না।

বরং যারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় কারণে যুদ্ধ করেনি, তাদের সঙ্গে সদাচরণ ও ন্যায়বিচার করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়—সদাচরণ ও ন্যায়বিচারকে একই আয়াতে পাশাপাশি স্থান দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ শুধু ভালো ব্যবহার করলেই দায়িত্ব শেষ নয়; মানুষের ন্যায্য অধিকার ও মর্যাদা রক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ।

তৃতীয় আয়াত: শত্রুতা ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান
সূরা আল-মুমতাহিনা, আয়াত ৯

আল্লাহ বলেন—

“আল্লাহ কেবল তাদের সঙ্গেই বন্ধুত্বপূর্ণ মিত্রতা স্থাপন করতে নিষেধ করেন, যারা দীনের ব্যাপারে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, তোমাদেরকে ঘরবাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে এবং তোমাদেরকে বের করার কাজে সহযোগিতা করেছে। আর যারা তাদের সঙ্গে মিত্রতা করে, তারাই জালিম।”

এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, নিষেধাজ্ঞাটি সব অমুসলিমের জন্য নয়।

বরং যারা ধর্মীয় কারণে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, তাদের উচ্ছেদ করেছে কিংবা সেই অন্যায় কাজে সহযোগিতা করেছে, তাদের সঙ্গে মিত্রতা ও পক্ষাবলম্বনের বিষয়টি এখানে আলোচিত হয়েছে।

অর্থাৎ শুধু ধর্মীয় পরিচয় নয়, বরং মানুষের আচরণ, ভূমিকা ও আগ্রাসনের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

এবার একটু চিন্তা করে দেখুন!

আপনি হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান কিংবা অন্য কোনো ধর্মের অনুসারী হতে পারেন। আপনার বিশ্বাস ও ধর্মীয় পরিচয় একজন মুসলমানের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা হতে পারে।

কিন্তু আপনি যদি ধর্মীয় কারণে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করেন, তাদের ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ না করেন কিংবা এমন অন্যায় কাজে সহযোগিতা না করেন, তাহলে শুধু আপনার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে আপনার সঙ্গে সদাচরণ ও ন্যায়বিচার করতে ইসলাম নিষেধ করে না।

বরং কোরআন এমন মানুষের প্রতিই সদাচরণ ও ন্যায়বিচারের নির্দেশ দিয়েছে।

ভাবতে পারেন, বিষয়টি কতটা তাৎপর্যপূর্ণ?

একজন মানুষের ধর্মীয় পরিচয় আলাদা হলেও তাঁর মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকারকে উপেক্ষা করার শিক্ষা এখানে দেওয়া হয়নি।

ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য কোথায়?

এই তিনটি আয়াত একসঙ্গে পড়লে ইসলামের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সামনে আসে—

১. ধর্মীয় স্বাধীনতা: কাউকে জোর করে ধর্মান্তরিত করা যাবে না।

২. মানবিক সহাবস্থান: যারা শত্রুতা ও আগ্রাসনে জড়িত নয়, তাদের সঙ্গে সদাচরণ ও ন্যায়বিচার করতে হবে।

৩. অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান: যারা যুদ্ধ, উচ্ছেদ ও নিপীড়নে জড়িত, তাদের আগ্রাসনকে সমর্থন করা যাবে না।

আমার কাছে এই শিক্ষাগুলোর মধ্যে একটি গভীর মানবিক দর্শন রয়েছে।

ইসলাম অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে বলে, কিন্তু নিরপরাধ মানুষের প্রতি অন্যায় করার অনুমতি দেয় না। ইসলাম ন্যায়বিচারের কথা বলে, সদাচরণের কথা বলে এবং মানুষের সঙ্গে মানবিক আচরণের শিক্ষা দেয়।

তাই কোনো ব্যক্তির ধর্মীয় পরিচয় দেখে তার প্রতি ঘৃণা, বিদ্বেষ কিংবা সহিংসতাকে ইসলামের শিক্ষা হিসেবে প্রচার করা কোরআনের সামগ্রিক বক্তব্যকে ভুলভাবে উপস্থাপন করা।

আমার কথা খুব পরিষ্কার—কেউ মুসলমান না হলেই তিনি মুসলমানের শত্রু নন। ধর্মীয় ভিন্নতা আর শত্রুতা এক বিষয় নয়।

আপনি হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান কিংবা অন্য কোনো ধর্মের অনুসারী হতে পারেন। আপনার বিশ্বাস আলাদা হতে পারে। কিন্তু আপনার প্রতি সদাচরণ ও ন্যায়বিচারের শিক্ষা ইসলাম নিজেই দিয়েছে।

ইসলামকে জানুন, কোরআন পড়ুন, আয়াতের প্রেক্ষাপট বুঝুন। অন্যের প্রচারণা দিয়ে কোনো ধর্মকে বিচার করবেন না।

কারণ, সত্যকে জানতে হলে প্রচারণা নয়, মূল উৎসের কাছে যেতে হয়।
ধর্মীয় পরিচয় মানুষকে আলাদা করতে পারে, কিন্তু ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও পারস্পরিক সম্মান মানুষকে একত্রিত করতে পারে।

কেউ মুসলমান না হলেই তিনি মুসলমানের শত্রু নন। ধর্মীয় ভিন্নতা আর শত্রুতা এক বিষয় নয়।


আপনার মতামত লিখুন :
এই বিভাগের আরও খবর পড়ুন
এক ক্লিকে বিভাগের খবর