একটি শিশুর কাছে পৃথিবী মানে বাবা-মায়ের হাত ধরে পথ চলা। বাবার হাত ধরে স্কুলে যাওয়া, মায়ের আঁচলে মুখ লুকিয়ে অভিমান ভাঙানো। কিন্তু পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার খানমরিচ ইউনিয়নের খানমরিচ কলেজপাড়ার দশ বছরের এক শিশুর জীবনে সেই পৃথিবীটা অনেক আগেই হারিয়ে গেছে। বাবা নেই, মাও নেই। বাবা-মায়ের ভালোবাসার ছায়া হারিয়ে এখন অন্যের আশ্রয়ে চলছে তার জীবন। বলছিনাম মোছা. সুরাইয়া খাতুন। বয়স মাত্র ১০ বছর। স্থানীয় সি.কে.বি আলিম মাদ্রাসার তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী সে। যে বয়সে খেলাধুলা আর পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা, সেই বয়সেই সুরাইয়ার জীবনজুড়ে কেবল অভাব, অনিশ্চয়তা আর হারানোর গল্প।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, সুরাইয়ার বাবা আমিন সরকার প্রায় আট বছর আগে ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। বাবাকে বাঁচাতে নিজেদের সর্বস্ব দিয়ে চেষ্টা করেছিলেন পরিবারের সদস্যরা। চিকিৎসার খরচ জোগাতে বিক্রি করতে হয়েছে জমি, এমনকি বসতবাড়িও। কিন্তু সব চেষ্টা, সব সম্পদ, সব আকুতি শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কাছে হার মানে। দুই বছর বয়সেই সুরাইয়া হারিয়ে ফেলে বাবাকে। আর স্বামীকে হারিয়ে একা হয়ে যান সুরাইয়ার মা সুফিয়া খাতুন। নিজের কষ্টের কথা ভুলে দুই মেয়েকে (বড় মেয়ে লামিয়া ও ছোট মেয়ে সুরাইয়া) বাঁচিয়ে রাখার লড়াই শুরু করেন তিনি। মানুষের বাড়িতে কাজসহ বিভিন্ন ধরনের শ্রম দিয়ে মেয়েদের মুখে খাবার তুলে দিতেন। অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। তারপরও দুই মেয়েকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন মা। কিন্তু সেই স্বপ্নও বেশি দিন টেকেনি। প্রায় এক বছর আগে স্ট্রোকজনিত কারণে মারা যান সুফিয়া খাতুন। এবার সত্যিকার অর্থেই এতিম হয়ে যায় ছোট মেয়ে সুরাইয়া। মা বেঁচে থাকতেই বড় মেয়ে লামিয়ার বিয়ে হয় একই ইউনিয়নের পার্শ্ববর্তী চন্ডিপুর গ্রামে। বিয়ের পর থেকে সেখানেই সংসার করছেন তিনি। ফলে মা হারানোর পর সুরাইয়ার মাথার ওপর আপন বলতে কার্যত আর কেউ রইল না।
আরও জানা যায়, মা মারা যাওয়ার পর একটি পরিবার সুরাইয়াকে দত্তক নিয়ে তাদের কাছে রাখে। সুরাইয়া ভেবেছিল, হয়তো এবার তার জীবনে আবারও একটু আশ্রয় মিলবে। কিন্তু সেই আশ্রয়ও হয়ে ওঠে কষ্টের। সেখানে নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। পরে বিষয়টি জানতে পেরে সুরাইয়ার চাচাতো বোন মনজুয়ারা-আব্দুর রহিম দম্পতি তাকে নিজেদের বাড়িতে নিয়ে আসেন। সেই থেকে নিজেদের সামর্থ্যের মধ্যে সুরাইয়ার পড়াশোনা, খাবার, পোশাক ও ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন করছেন তারা।
স্থানীয় বাসিন্দারাও সুরাইয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, যে পরিবারটি সুরাইয়াকে আশ্রয় দিয়েছে, তাদের নিজেদের সংসারও চলে টানাটানির মধ্যে। নিত্যদিনের প্রয়োজন মেটাতেই যেখানে হিমশিম খেতে হয়, সেখানে সুরাইয়ার অতিরিক্ত ভরণপোষণের দায়িত্ব নেওয়া তাদের জন্যও কঠিন হয়ে পড়েছে। একদিকে পড়াশোনার খরচ, অন্যদিকে খাবার, পোশাক ও দৈনন্দিন প্রয়োজন সব মিলিয়ে ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আশ্রয়দাতা পরিবার।
তারপরও সুরাইয়া থেমে নেই। বাবা নেই, মা নেই—তবুও তার চোখে স্বপ্ন আছে। সে পড়তে চায়, বড় হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়। বাবা-মায়ের ছায়া হারানো শিশুটির পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে সমাজের বিত্তবান মানুষ ও প্রশাসনের সহযোগিতা প্রয়োজন।
সুরাইয়া বলে, “আমার বাবা-মা কেউ নেই। বাবা যখন মারা যায়, তখন আমি অনেক ছোট ছিলাম। মায়ের কাছে থাকতাম, মা-ই আমাদের দেখাশোনা করত। কিন্তু মাও মারা যাওয়ার পর আমি খুব একা হয়ে গেছি। অন্যদের যখন বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখি, তখন আমারও বাবা-মায়ের কথা মনে পড়ে। মনে হয়, আমার বাবা-মা যদি আজ বেঁচে থাকত, তাহলে আমিও তাদের সঙ্গে থাকতাম।”
সুরাইয়া আরও বলে, এখন আমি আমার চাচাতো বোনের বাড়িতে থাকি। তারা আমাকে অনেক আদর করে, আমার খাওয়া-পড়ার খরচ চালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু তাদেরও তো সংসার আছে, অনেক কষ্ট করে আমাকে রাখে। আমি পড়াশোনা করতে চাই। বড় হয়ে মানুষের মতো মানুষ হতে চাই। নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই। আমি চাই না টাকার অভাবে আমার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাক।
সুরাইয়ার চাচাতো বোন মনজুয়ারা বলেন, সুরাইয়ার বাবা-মা কেউই বেঁচে নেই। তাই নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী তাকে আমাদের কাছে এনে রাখছি। কিন্তু আমাদের নিজেদের সংসারও খুব সচ্ছল নয়। অনেক কষ্ট করে তার খাওয়া-পড়া চালিয়ে নিতে হচ্ছে। সুরাইয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা চিন্তায় আছি। সমাজের বিত্তবান মানুষ ও সরকারিভাবে সহযোগিতা করলে মেয়েটার পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎটা ভালোভাবে গড়ে দেওয়া সম্ভব।
সুরাইয়ার শিক্ষক মো. মোজাহুরুল ইসলাম বলেন, বাবা-মা না থাকলেও পড়াশোনার প্রতি সুরাইয়ার আগ্রহ রয়েছে। সুযোগ ও সহযোগিতা পেলে সে ভালোভাবে পড়াশোনা করে ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে। অর্থের অভাবে তার পড়াশোনা যেন বন্ধ না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে এগিয়ে আসা প্রয়োজন।
সুরাইয়ার এই অসহায়ত্বের কথা জানেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও। একজন এতিম শিশুর পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে স্থানীয়ভাবে কী ধরনের সহযোগিতা করা সম্ভব এমন প্রশ্নের উত্তরে খানমরিচ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মনোয়ার হোসেন খান মিঠু সুরাইয়ার পাশে থাকার আশ্বাস দিয়ে বলেন, “সুরাইয়ার বিষয়টি মানবিকভাবে বিবেচনা করে তার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করা হবে। ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে যেটুকু সম্ভব সব ধরনের সহযোগিতা করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
ভাঙ্গুড়া উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, সুরাইয়ার মতো অসহায় ও এতিম শিশুর জন্য সরকারি সহায়তার সুযোগ রয়েছে। তার প্রয়োজন শুধু আজকের খাবার নয়। তার প্রয়োজন একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ। বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে যাচাই করে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সহযোগিতার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ভাঙ্গুড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আরিফুজ্জামান বলেন, শুধু ব্যক্তিগত বা স্থানীয় সহযোগিতা নয়, রাষ্ট্রীয়ভাবেও এতিম ও অসহায় শিশুদের জন্য রয়েছে বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা ও সহায়তার ব্যবস্থা। সুরাইয়ার বিষয়টি প্রশাসনের নজরে রয়েছে। তার শিক্ষা, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতার বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সুরাইয়ার স্বজনদের প্রত্যাশা, প্রশাসনের উদ্যোগের পাশাপাশি সমাজের সামর্থ্যবান মানুষগুলোও যদি সুরাইয়ার পাশে দাঁড়ান, তাহলে হয়তো তার জীবনের গল্পটা অন্যরকম হতে পারে। যে মেয়েটি ছোটবেলাতেই হারিয়েছে বাবা-মাকে, সে যেন বড় হয়ে বলতে পারে—‘আমি একা ছিলাম না, মানুষ আমার পাশে দাঁড়িয়েছিল।’ সুরাইয়ার চোখে এখনও স্বপ্ন আছে। সে পড়তে চায়, নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়। বাবা-মায়ের হারানো ছায়া হয়তো আর কখনো ফিরে আসবে না, কিন্তু মানুষের ভালোবাসা ও সহযোগিতা তার সেই স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে। এখন প্রশ্ন একটাই কে দেখবে সুরাইয়ার ভবিষ্যৎ?