কক্সবাজার শহরকে কেন্দ্র করে সিটি করপোরেশন গঠন ও প্রশাসনিক সীমানা পুনর্নির্ধারণ সংক্রান্ত আলোচনা যত এগোচ্ছে, ততই কক্সবাজার সদর উপজেলার ভারুয়াখালী ও চৌফলদণ্ডী ইউনিয়নের সর্বস্তরের মানুষের মাঝে এক অজানা শঙ্কা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। স্থানীয়দের মাঝে আলোচনা ও গুঞ্জন চলছে—সদর উপজেলার অন্যান্য অংশ যদি নতুন সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত হয়ে যায়, তবে অবশিষ্টাংশ হিসেবে থাকা ভারুয়াখালী ও চৌফলদণ্ডী ইউনিয়নকে হয়তো পার্শ্ববর্তী অন্য কোনো উপজেলায় (যেমন: রামু বা নতুন গঠিত ঈদগাঁও) সংযুক্ত করে দেওয়া হতে পারে।
তবে বাংলাদেশের প্রশাসনিক বাস্তবতা, আইনগত কাঠামো এবং ইতিপূর্বে গঠিত সিটি করপোরেশনগুলোর ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই আতঙ্ক একেবারেই অমূলক। অহেতুক বিভ্রান্ত না হয়ে ভারুয়াখালী ও চৌফলদণ্ডীর সচেতন নাগরিকদের প্রশাসনিক আইন ও অধিকার সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখা প্রয়োজন।
কেন এই দুটি ইউনিয়ন নিয়েই “কক্সবাজার সদর উপজেলা” তার প্রশাসনিক ও আইনি অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারে এবং রাখতে বাধ্য, তার সুনির্দিষ্ট যুক্তিগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. সিটি করপোরেশনে অন্তর্ভুক্ত না হলেও সদর উপজেলা বহাল থাকবে:
প্রশাসনিক পরিবর্ধনে কোনো গ্রামীণ এলাকা যদি সিটি করপোরেশনের অবকাঠামোগত মানদণ্ড পূরণ না করে, তবে তাকে জোরপূর্বক সিটি করপোরেশনে যুক্ত করা হয় না। কিন্তু সিটি করপোরেশনে অন্তর্ভুক্ত না হতে পারার অর্থ এই নয় যে এলাকাটির নিজস্ব উপজেলার পরিচয় হারিয়ে যাবে। সিটি করপোরেশনের আওতাবহির্ভূত গ্রামীণ ইউনিয়ন হিসেবে ভারুয়াখালী ও চৌফলদণ্ডীকে নিয়েই স্বতন্ত্রভাবে কক্সবাজার সদর উপজেলা বহাল রাখা প্রশাসনিক আইনেই শতভাগ স্বীকৃত।
২. সচেতন মহলের ঐক্যবদ্ধ নেতৃত্ব ও সময়ের দাবি:
প্রশাসনিক সীমানা নির্ধারণের এই সন্ধিক্ষণে অহেতুক আতঙ্কিত না হয়ে দুটি ইউনিয়নের শিক্ষক, আইনজীবী, তরুণ ছাত্রসমাজ, পেশাজীবী ও সচেতন মহলকে বলিষ্ঠ ভূমিকা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। এটি ঘরে বসে থাকার সময় নয়; বরং এলাকার ভৌগোলিক অধিকার ও নাগরিক সুবিধা রক্ষার স্বার্থে দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে এখনই সোচ্চার হওয়া সময়ের সর্বপ্রধান দাবি। সচেতন সমাজ যদি গঠনমূলকভাবে দাবির আইনি ও প্রশাসনিক যৌক্তিকতা তুলে ধরে, তবে সাধারণ মানুষের বিভ্রান্তি দূর হবে এবং প্রশাসনিক পর্যায়েও সঠিক বার্তা পৌঁছাবে।
৩. জনগণের যৌক্তিক দাবি সরকার এড়িয়ে যেতে পারবে না:
বাংলাদেশে যেকোনো প্রশাসনিক ইউনিট পুনর্গঠনে ‘জনস্বার্থ’ ও ‘ভৌগোলিক সান্নিধ্য’ হলো প্রধান আইনি মানদণ্ড। ভারুয়াখালী ও চৌফলদণ্ডীর শতভাগ মানুষ, জনপ্রতিনিধি ও সচেতন নাগরিকেরা যখন একাট্টা হয়ে জেলা সদরে থাকার যৌক্তিক কারণ তুলে ধরবেন, তখন সরকার বা প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় কমিটি (NICAR) কোনোভাবেই এই জনদাবি এড়িয়ে যেতে পারবে না। আইনের শাসন ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় জনমতের বিরুদ্ধাচরণ করে ওপর থেকে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।
৪. থানা ও উপজেলা ভবন সিটি করপোরেশনের ভেতরে গেলেও সমস্যা নেই:
অনেকে আশঙ্কা করছেন যে সদর থানা বা উপজেলা পরিষদ ভবন সিটি করপোরেশনের সীমানার ভেতরে চলে গেলে ইউনিয়ন দুটি প্রশাসনিক সেবা থেকে বঞ্চিত হবে। এটি একটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। সিটি করপোরেশন হলো ‘নগর সেবামূলক সংস্থা’, আর থানা ও উপজেলা হলো ‘বিচারিক ও প্রশাসনিক ইউনিট’। ভবন সিটি করপোরেশনের ভেতরে থাকলেও আইনগতভাবে সেই একই ভবন থেকে ভারুয়াখালী ও চৌফলদণ্ডী ইউনিয়নের সেবা প্রদান চালু রাখা সম্ভব। প্রয়োজনে যাতায়াতের সুবিধার্থে ইউনিয়ন দুটির সমন্বয়ে একটি ‘পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র’ (Police Outpost) গঠন করেও তাৎক্ষণিক আইনশৃঙ্খলা সেবা নিশ্চিত করা যায়।
৫. জেলা সদরের সাথে ঐতিহাসিক যোগাযোগ ও নাগরিক সুবিধা:
ভারুয়াখালী ও চৌফলদণ্ডী ইউনিয়নের সামাজিকভাবে গড়ে ওঠা বাণিজ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা ও যোগাযোগের মূল কেন্দ্র চিরকালই জেলা শহর। জজ কোর্ট, জেলা হাসপাতাল, জেলা পুলিশ প্রশাসন এবং অন্যান্য সব জেলা পর্যায়ের সরকারি দপ্তর থেকে সেবা নেওয়ার জন্য এই দুই ইউনিয়নের বাসিন্দাদের প্রতিনিয়ত জেলা সদরেই যাতায়াত করতে হয়। ইউনিয়ন দুটিকে যদি ভুল সিদ্ধান্তে অন্য কোনো উপজেলায় স্থানান্তর করা হয়, তবে সাধারণ মানুষকে প্রশাসনিক कामकाজের জন্য নতুন উপজেলায় যেতে হবে, আবার জীবনজীবিকার প্রয়োজনে জেলা সদরে আসতে হবে—যা সীমাহীন দুর্ভোগ, অতিরিক্ত যাতায়াত খরচ ও সময়ের অপচয় ঘটাবে।
৬. ভূমি রেকর্ড ও প্রশাসনিক জটিলতা:
একটি ইউনিয়নকে অন্য উপজেলায় হস্তান্তর করার প্রক্রিয়া কেবল নতুন সীমানা আঁকার বিষয় নয়; এটি জনগণের ভূসম্পত্তির ওপর এক বিশাল প্রশাসনিক বোঝা চাপিয়ে দেয়। ভূমি অফিস (এসি ল্যান্ড ও তহসিল কার্যালয়) এবং সাব-রেজিস্ট্রি অফিস পরিবর্তনের ফলে খতিয়ান স্থানান্তর, জমি রেজিস্ট্রি, নামজারি ও রেকর্ড সংশোধন নিয়ে সাধারণ মানুষকে বছরের পর বছর চরম হয়রানির শিকার হতে হবে।
৭. জাতীয় প্রশাসনিক নজির (গাজীপুর, কুমিল্লা ও নারায়ণগঞ্জ):
অনেকের মনে একটি ভুল ধারণা ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে, “মাত্র দুটি ইউনিয়ন নিয়ে সদর উপজেলা কীভাবে বহাল থাকবে?” বাংলাদেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় এমন সিদ্ধান্ত একেবারেই স্বাভাবিক ও প্রচলিত। উদাহরণস্বরূপ:
সুতরাং, আইনগতভাবে ভারুয়াখালী ও চৌফলদণ্ডী—এই দুটি ইউনিয়ন নিয়ে কক্সবাজার সদর উপজেলা হিসেবে টিকে থাকার পথে কোনো প্রশাসনিক বাধা নেই।
আমাদের করণীয় ও প্রশাসনিক আহ্বান:
অতএব, ভারুয়াখালী ও চৌফলদণ্ডীর সচেতন মহলসহ সর্বস্তরের বাসিন্দাদের অহেতুক আতঙ্কিত না হয়ে সুসংগঠিত হতে হবে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, তরুণ সমাজ, সুশীল সমাজ ও পেশাজীবীদের উচিত জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা ও প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত কমিটির (NICAR) কাছে সুনির্দিষ্ট স্মারকলিপি পেশ করা।
ঐতিহ্য, ভৌগোলিক সুবিধা এবং জনস্বার্থের নিরিখে ভারুয়াখালী ও চৌফলদণ্ডী ইউনিয়ন নিয়েই বহাল থাকুক আমাদের প্রিয় “কক্সবাজার সদর উপজেলা”।