শনিবার, ৩০ মে ২০২৬, ০৪:৫২ অপরাহ্ন

ফসলি জমি কেটে সাবাড় আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ কী?- এস এম মাসুদ রানা

চলনবিলের আলো ডেস্ক:
আপডেট সময়: বৃহস্পতিবার, ৭ মে, ২০২৬, ৩:১৩ অপরাহ্ন

বাংলার মাটি একদিন ছিল ধানের গন্ধে ভরা—সবুজে মোড়া এক বিস্তৃত জীবনের ক্যানভাস। কিন্তু আজ সেই ক্যানভাসে ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে ভিন্ন এক চিত্র। সারা দেশে ক্রমবর্ধমান হারে ফসলি জমি কেটে তৈরি হচ্ছে অসংখ্য পুকুর—মাছ চাষের নামে জমির রূপান্তর ঘটছে এক নীরব বিপ্লবে। এই পরিবর্তন কেবল অর্থনীতির নয়, এটি প্রকৃতি, সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উপর গভীর ছাপ ফেলছে।

একসময় যে জমিতে সোনালি ধান দুলতো, সেখানে এখন স্থির জলের স্তর। কৃষকের হাতে লাঙলের বদলে এসেছে জাল। তাৎক্ষণিক লাভের আশায় অনেকেই এই পথে ঝুঁকছেন—মাছ চাষের দ্রুত মুনাফা তাদের টানছে। কিন্তু এই ক্ষণিক লাভের আড়ালে লুকিয়ে আছে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির ছায়া।

প্রথমত, ফসলি জমির পরিমাণ কমে গেলে খাদ্য উৎপাদন স্বাভাবিকভাবেই হ্রাস পাবে। বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে এটি খাদ্য নিরাপত্তার জন্য এক বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। আগামী দিনে ধান, গম বা অন্যান্য শস্যের ঘাটতি দেখা দিলে তা শুধু অর্থনৈতিক সংকটই নয়, সামাজিক অস্থিরতাও ডেকে আনতে পারে।

দ্বিতীয়ত, পুকুর খননের ফলে ভূমির প্রাকৃতিক গঠন ও জলচক্রে পরিবর্তন আসে। অতিরিক্ত জলাবদ্ধতা, ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের অস্বাভাবিক ওঠানামা, এবং আশপাশের জমির উর্বরতা হ্রাস—এসবই পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, পাশের জমিগুলোও ধীরে ধীরে চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়ে।

তৃতীয়ত, জীববৈচিত্র্যের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এক ফসলি জমিতে যে বৈচিত্র্যময় প্রাণ ও উদ্ভিদের সহাবস্থান ছিল, তা একরকম একঘেয়ে জলাশয়ে পরিণত হয়। এতে করে প্রাকৃতিক খাদ্য শৃঙ্খল ভেঙে পড়ে এবং পরিবেশে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। পুকুর থেকে যখন গাড়ী দিয়ে মাটি নিয়ে যায় তখন দ্রুত রাস্তা ন্ষ হয়ে যায় চলাচলের জন্য অনুপুযোগী হয়ে যায়। বৃষ্টি হলে রাস্তায় পিচ্ছিল হয়ে দূর্ঘটনা হবার সম্ভাবনা বেড়ে যায় ।
সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি থেকে যায়—আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ কী?
যদি এই ধারা অব্যাহত থাকে, তবে হয়তো একদিন তারা বইয়ের পাতায় পড়বে ‘ধানের মাঠ’—যা তারা নিজের চোখে আর দেখবে না। খাদ্যের জন্য নির্ভর করতে হবে আমদানির ওপর, যা একটি স্বাধীন দেশের জন্য কখনোই কাম্য নয়। প্রকৃতির সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে তারা বড় হবে এক কৃত্রিম পরিবেশে, যেখানে মাটির গন্ধ আর গ্রামীণ জীবনের স্বাদ হারিয়ে যাবে।

তবে এখনো সময় আছে। সচেতনতা, সঠিক নীতিমালা ও কৃষি জমি রক্ষার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। উন্নয়ন প্রয়োজন, কিন্তু তা হতে হবে টেকসই—যেখানে অর্থনীতি ও প্রকৃতি একসাথে এগিয়ে যাবে।

বাংলার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আজকের সিদ্ধান্তের ওপর। আমরা যদি মাটিকে বাঁচাতে পারি, তবে মাটিই আমাদের বাঁচিয়ে রাখবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর পড়ুন
এক ক্লিকে বিভাগের খবর