মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬, ১১:৫২ অপরাহ্ন

তথ্যের সুনামিতে মানবমস্তিষ্ক ও সংবাদমাধ্যমের দ্বায়িত্ব

চলনবিলের আলো ডেস্ক:
আপডেট সময়: মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬, ৫:৪২ অপরাহ্ন

বিখ্যাত নিউরন জার্নালে ২০২৪ সালে প্রকাশিত মার্কিন নিউরোবায়োলজিস্ট মার্কাস মাইস্টার ও গবেষক জিয়েউ ঝেং-এর যুগান্তকারী গবেষণায় দেখানো হয়, “মানুষের চিন্তার গতি সর্বোচ্চ ১০ বিট (কম্পিউটার তথ্যের ছোট একক) প্রতি সেকেন্ড।”অর্থাৎ মানুষের মস্তিষ্ক প্রতি মুহূর্তে যে পরিমাণ তথ্য প্রক্রিয়াজাত করতে পারে, তার একটি নির্দিষ্ট সীমা আছে- যা ‘কগনিটিভ লোড ক্যাপাসিটি’। এই সীমা পেরোলেই মস্তিষ্ক কাজ করতে শুরু করে আপৎকালীন পদ্ধতিতে। অর্থাৎ যত বেশি তথ্য ছুঁড়ে দেওয়া হচ্ছে, তত কম ভাবছে মানুষ। প্রতিক্রিয়া বাড়ছে ঠিকই, তবে চিন্তা কমছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়টাকে আরও জটিল করে তুলছে। একটি এআই মডেল ভুলভাল, পক্ষপাতিত্ব আর কাল্পনিক মিলে এক সেকেন্ডে হাজার হাজার কনটেন্ট তৈরি করতে পারে। মানুষ সেই তথ্য পড়ছে, শেয়ার করছে, তার ওপর ভিত্তি করে রাগ করছে, আনন্দ করছে, ভয় পাচ্ছে। অথচ, আমাদের মস্তিষ্ক বিবর্তনের ধারায় এখনও সেই সক্ষমতা অর্জন করেনি, যেখানে সেকেন্ডের মধ্যে এআই-জেনারেটেড তথ্য আর মানুষের লেখার পার্থক্য বুঝে ফেলবে।
কারণ, বিবর্তনকে সময় দিতে হয়। অথচ সমস্যা হচ্ছে, বিবর্তনকে দেওয়ার মতো সময় আমাদের এবং সংবাদমাধ্যমের কাছে নেই!
মার্কিন গবেষক, মিডিয়া ও কালচারাল স্টাডিজের অধ্যাপক কেট আইখর্ন ২০২২ সালে ‘কনটেন্ট’ নামে বই প্রকাশ করলেন। সেখানে বললেন, ২০০০ সালের দিকে ইন্টারনেটের গতি বেড়ে যাওয়া, সোশ্যাল মিডিয়ার উত্থান, গুগল অ্যাডসেন্স চালু হওয়ার প্রেক্ষাপটে ‘খবর’, ‘ভিডিও’, ‘ছবি’ সবকিছুর জন্য নিরপেক্ষ ও গুণগত বিচারহীন শব্দের দরকার পড়েছিল। পুরোনো ‘নিউজ’ বা ‘প্রোগ্রাম’ শব্দগুলো সংকীর্ণ মনে হওয়ায় ‘কন্টেন্ট’ শব্দটি তখন দ্রুত জায়গা করে নেয়।
ফলে আগের ‘নিউজ পড়া’ এসে ঠেকলো ‘কন্টেন্ট কনজিউম’ শব্দে। ‘পাঠক’ পরিণত হলেন ‘অডিয়েন্স’ বা ‘ইউজারে’। গুগল অ্যাডসেন্সের বদৌলতে হাজির হলো ‘হিট’, ‘ভিউ’, ‘ট্রাফিক’ শব্দগুলো। আগের দিনের ‘খবর’ ছিল যাচাই করা সত্যতথ্য। অথচ এ যুগে একটা ছবিও ‘কনটেন্ট’। কেট আইখর্নের ভাষায়, ‘কন্টেন্ট’ মানে ‘শুধু ছড়ানোর জন্যই ছড়ানো উপাদান’। যেমন- একটা ভাইরাল ছবি, যার ভেতরে কোনো জ্ঞান বা তথ্য নেই। অথচ কোটি কোটি মানুষ দেখছে।
২০২০ সালের পর মানবজাতির তথ্য ও জ্ঞান প্রতি ১২ ঘণ্টায় বা একদিনে দ্বিগুণ হতে শুরু করে। অনেক গবেষকের মতে, চিকিৎসাবিজ্ঞান, জিনতত্ত্ব বা এআই গবেষণার মতো কিছু ক্ষেত্রে এই সময় নেমে এসেছে আরও সংক্ষিপ্ত হয়ে। বলা হচ্ছে, এক কাপ চা খেতে খেতে পৃথিবীর সব আবিষ্কৃত জ্ঞান আগের চেয়ে দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে।
তথ্য-জ্ঞান বিস্ফোরণ আমাদের মস্তিষ্কের ওপর প্রতিমুহূর্তে সুনামির ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ছে। এ ক্ষেত্রে মানবমস্তিষ্ক কতটা সক্ষম তথ্য-জ্ঞানের এমন বিস্ফোরণ সামাল দিতে?
বিবর্তনের ধারায় মানুষের মস্তিষ্ক লাখ লাখ বছর ধরে গড়ে উঠেছে ধীর, স্থির, নির্ভরযোগ্য পরিবেশের জন্য। যে সময়ে তথ্য আসতো ধীরে, মুখে মুখে, গল্পে গল্পে, পুঁথির পাতায় পাতায়। তখন মস্তিষ্কের কাজ ছিল শুধু তথ্য যাচাই, গভীরভাবে প্রক্রিয়াজাত, আবেগের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া আর দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিতে সংরক্ষণ করা। এআই-জেনারেটেড তথ্যের বিষয় তখন কল্পনারও বাইরে ছিল।
বিবর্তনের শিক্ষা হচ্ছে, বিপদের সময় মানুষের মধ্যে ‘ফাইট অর ফ্লাইট’ মুড সক্রিয় হয়। অর্থাৎ যুদ্ধ করে অথবা পলায়ন করে। তথ্যের সুনামিতে ‘পলায়ন’ অর্থ খবর না পড়া, সংবাদমাধ্যম থেকে দূরে সরে যাওয়া। আর ‘যুদ্ধ’ এখানে ক্ষোভ আর হতাশা। ফলে সংবাদমাধ্যমের কাজ হচ্ছে, তথ্যের সুনামি নয়, সমাধানের তথ্যও উপস্থাপন করা। সমাধানের পথ বা সফলতার দৃষ্টান্তগুলো মানুষের মস্তিষ্কে ‘প্রত্যাশার নিউরন’ সক্রিয় করে তোলে। যা বিবর্তন ধারায় মানুষের টিকে থাকার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
গত কয়েক দশক ধরে ব্যাপক আলোচিত একটা শব্দ হচ্ছে, ‘তথ্যের মহাসমুদ্র’। বলা হচ্ছে, প্রতিমুহূর্তে পৃথিবীতে কোটি কোটি তথ্য উৎপাদিত হচ্ছে। আর আমরা তথ্যের মহাসমুদ্রে হাবুডুবু খাচ্ছি। এতে প্রশ্ন এসে যায়, তথ্য ব্যবহার করে প্রতিদিন যে ‘খবর’ বা ‘কনটেন্ট’ তৈরি হচ্ছে তার পরিমাণ আসলে কত?
ইন্টারনেটের এক মিনিটের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ৬০ সেকেন্ডে ইউটিউবে ৫০০ ঘণ্টা ভিডিও, ফেসবুকে ১ লাখ ৩৬ হাজার ছবি ও ২ লাখ ৯৩ হাজার স্ট্যাটাস, এবং টুইটারে (বর্তমানে এক্স) প্রায় ৩ লাখ ১৯ হাজার টুইট বা পোস্ট হয়ে থাকে।
ইউটিউব :-
ভিডিও আপলোড: ৫০০ ঘণ্টা (দৈনিক প্রায় ৭ লক্ষ ২০ হাজার ঘণ্টা)। ভিডিও দেখা হয়: ৭ লক্ষ ঘণ্টা।
ফেসবুক :
স্ট্যাটাস আপডেট: ২ লাখ ৯৩ হাজার।
ছবি আপলোড: ১ লাখ ৩৬ হাজার।
মন্তব্য (Comment) পোস্ট: ৫ লাখ ১০ হাজার।ইন্টারঅ্যাকশন: ১৭ লাখ।
টুইটার/এক্স:
টুইট বা পোস্ট: ৩ লাখ ১৯ হাজারের বেশি।
ইনস্টাগ্রাম :
স্টোরি শেয়ার: ৩ লাখ ৪৭ হাজার।
নতুন ছবি পোস্ট: ১ লাখ ৪৭ হাজার।
হোয়াটসঅ্যাপ :
মেসেজ আদান-প্রদান: ৪১ মিলিয়নেরও (৪ কোটি ১০ লাখ) বেশি।
মিডিয়া বিশ্লেষকদের মতে, তথ্য-জ্ঞান বিস্ফোরণের এই যুগে মানুষের মধ্যে   সংবাদমাধ্যমের তথ্যে ‘বিশ্বাস’ ফিরিয়ে আনতে নিউজরুমে টেকসই ‘লাইফবোট’ তৈরি সহ প্রতিটি কনটেন্টে ‘ভেরিফাইড ট্রাস্ট মার্ক’ যুক্ত করে দেওয়া জরুরি। যেখানে তথ্যের উৎস আর যাচাই করার প্রক্রিয়া যুক্ত থাকবে। কনটেন্ট এআই-জেনারেটেড হলে তা জানিয়ে দিতে হবে। পাশাপাশি তথ্যের ‘ডোজ’ও নির্ধারণ করে দিতে হবে। মনে রাখতে হবে ঘণ্টায় ঘণ্টায় ‘ব্রেকিং নিউজ’ হজম করার জন্য মানবমস্তিষ্ক এখনও সক্ষম নয়। সমাধানভিত্তিক ও গঠনমূলক খবর থাকতে হবে। নিউজরুমের আরেকটি অঙ্গীকার হলো ‘ডিজিটাল ওয়েলনেস’। শুধু খবর পরিবেশন নয়, খবর গ্রহণের সুস্থ পদ্ধতি জানানো, স্ক্রিন টাইম কমানোর টিপস দেওয়া, তথ্য ডিটক্সের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, গভীর পাঠের অভ্যাস গড়ে তোলা আর নিউজ ফাস্টিং-এর মতো বিষয়গুলো বর্তমানে অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সত্যের কষ্টিপাথরে যাচাই করা সময়োপযোগী তথ্য-জ্ঞান পাঠক-অডিয়েন্সের দুয়ারে পৌঁছে দেওয়া সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব।  তাছাড়া মানুষের মধ্যে ‘লার্নড হেলপলেসনেস’ বা শিখে ফেলা অসহায়ত্ব বোধ হচ্ছে। এত তথ্য-জ্ঞান, এত এত সমস্যার পাহাড়, অথচ তার কিছুই করার নেই- এমন অনুভূতি মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ভীষণ ক্ষতিকর। ফলে সংবাদমাধ্যম যদি প্রতিমুহূর্তে শুধু সমস্যা নিয়ে চিৎকার দিতে থাকে তাহলে মানুষের মস্তিষ্ক আত্মরক্ষার জন্য তথ্যের সব দরজা-জানালা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবে।
  1. সাইদুজ্জামান সাগর
  2. সাংবাদিক


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর পড়ুন
এক ক্লিকে বিভাগের খবর