জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে পদত্যাগ করেছেন দলটির নেত্রী সামান্তা শারমিন। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে রাজনৈতিক জোট, ২০২৬ সালের নির্বাচনী কৌশল, গণঅভ্যুত্থানে নারীদের ভূমিকার যথাযথ স্বীকৃতি না দেওয়া এবং দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চার ঘাটতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে দলীয় নেতৃত্বের সঙ্গে মতপার্থক্যের কথা উল্লেখ করে তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করেন তিনি। একই সঙ্গে এনসিপির গতিপথ, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়ে নিজের অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক চিন্তাভাবনাও তুলে ধরেন।
পোস্টে সামান্তা শারমিন উল্লেখ করেন, প্রায় এক বছর আগে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এনসিপির জোট গঠনের প্রশ্নে তিনি ভিন্ন অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁর মতে, জামায়াতে ইসলামী নীতিগত কিংবা কৌশলগত কোনো দিক থেকেই সংস্কারপন্থী রাজনীতির উপযুক্ত মিত্র নয়। এ ধরনের জোটের কারণে এনসিপিকে রাজনৈতিকভাবে বড় মূল্য দিতে হতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেছিলেন।
তিনি জানান, গত ১১ মাস ধরে দলের বিভিন্ন পর্যায়ে লিখিত অভিযোগ, প্রস্তাব এবং আলোচনা-পর্যালোচনার মাধ্যমে দলকে তার প্রাথমিক মূল্যবোধ ও রাজনৈতিক লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে তাঁর মতে, এসব প্রচেষ্টা সত্ত্বেও দলের রাজনৈতিক গতিপথ পরিবর্তনের কোনো আগ্রহ দেখা যায়নি।
পদত্যাগের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সামান্তা শারমিন চারটি বিষয়কে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন।
জামায়াতের সঙ্গে জোট নিয়ে আপত্তি
জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এনসিপির রাজনৈতিক সম্পর্কের সমালোচনা করে তিনি বলেন, সাংবিধানিক সংস্কার, আইনের সংস্কার এবং রাজনৈতিক দলগুলোর কাঠামোগত সংস্কার—কোনোটিই জামায়াতের নিজস্ব রাজনৈতিক প্রকল্পের অংশ নয়। তাঁর অভিযোগ, জামায়াত প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক সংস্কারের রাজনীতি ধারণ করে না। বরং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের চেষ্টা করছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, জামায়াতের সঙ্গে জোটের ফলে এনসিপির নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় ও স্বতন্ত্র অবস্থান দুর্বল হয়েছে। এতে উদার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী সাধারণ মানুষের একটি অংশ দলটির রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে।
নির্বাচনী কৌশল নিয়ে অসন্তোষ
২০২৬ সালের নির্বাচনকে কেবল ক্ষমতা পরিবর্তনের নির্বাচন না করে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগ হিসেবে দেখার পক্ষে ছিলেন বলে জানান সামান্তা শারমিন। তাঁর মতে, এনসিপির সামনে পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ ছিল।
কিন্তু বড় রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোট করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্তে দলটি নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় ও গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন রাজনীতির সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলে তিনি মনে করেন।
তিনি দাবি করেন, ১১ দলীয় ঐক্যে অংশ না নিয়েও নির্বাচনের ফলাফলের চেয়ে বেশি রাজনৈতিক প্রভাব তৈরির জন্য পাঁচটি বিকল্প কৌশল তিনি দলীয় নেতৃত্বকে প্রস্তাব করেছিলেন। তবে নেতৃত্ব সেসব প্রস্তাব গ্রহণ করেনি।
এ প্রসঙ্গে শহীদ ওসমান হাদির নির্বাচনী ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মতে, ওসমান হাদির মৃত্যুর ঘটনাকে বড় রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোট করার যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা অযৌক্তিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
নারীর রাজনৈতিক অধিকার ও নেতৃত্বের প্রশ্ন
সামান্তা শারমিনের পদত্যাগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উঠে এসেছে এনসিপির অভ্যন্তরে নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বের প্রশ্ন।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে নারীরা সম্মুখসারিতে থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। কিন্তু অভ্যুত্থানের পর তাঁদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা, নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
তাঁর অভিযোগ, এনসিপি পুরোনো রক্ষণশীল রাজনৈতিক দলগুলোর মতোই নারীদের রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করেছে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে পুরুষ সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রভাব বজায় রেখেছে।
তিনি মনে করেন, নারীদের শুধু দলে অন্তর্ভুক্ত করলেই সমতা প্রতিষ্ঠিত হয় না; বরং নেতৃত্ব, সাংগঠনিক ক্ষমতা এবং নীতিনির্ধারণে তাঁদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হয়।
কাউন্সিল ছাড়াই পুনর্গঠন নিয়ে প্রশ্ন
দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন সামান্তা শারমিন। তাঁর অভিযোগ, নির্ধারিত কাউন্সিল আয়োজন না করে পুনরায় আহ্বায়ক কমিটি পুনর্গঠন বা রিস্ট্রাকচার করার সিদ্ধান্ত দলের গণতান্ত্রিক চর্চাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
তিনি বলেন, সময়মতো কাউন্সিল আয়োজন করা একটি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বের বৈধতা, জবাবদিহি ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। কাউন্সিল এড়িয়ে সাংগঠনিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতা কেন্দ্রীকরণ ও ভিন্নমত দমনের প্রবণতাই পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।
তাঁর মতে, যে দল নিজেদের অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব নির্বাচন নিশ্চিত করতে পারে না, সেই দলের পক্ষে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে গণতন্ত্র ও নিরপেক্ষতার দাবি তোলা কতটা বিশ্বাসযোগ্য, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
নতুন রাজনৈতিক শক্তি গঠনের আহ্বান
পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিভাজনের পরিবর্তে ঐক্যের রাজনীতি প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন সামান্তা শারমিন।
তিনি মনে করেন, দেশের প্রয়োজন এমন একটি রাজনৈতিক শক্তি, যার ভিত্তি হবে গণতন্ত্র, জাতীয় সার্বভৌমত্ব, নারীর সমান অংশগ্রহণ, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার এবং জনগণের স্বার্থ।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, চীনসহ কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি অন্ধ আনুগত্য কিংবা বিরোধিতার পরিবর্তে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, জাতীয় পুঁজির বিকাশ, দেশীয় উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস এবং দেশের সম্পদ ও নীতিনির্ধারণে জনগণের স্বার্থ নিশ্চিত করতে হবে।
পোস্টের শেষাংশে সামান্তা শারমিন বলেন, তরুণদের সামনে এখন চ্যালেঞ্জ শুধু নতুন একটি রাজনৈতিক দল গঠন করা নয়; বরং ভিন্নমত ও ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য নতুন রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলা।
এ লক্ষ্যে তাঁর সঙ্গে বিস্তারিত মতবিনিময় করতে আগ্রহীদের যোগাযোগের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।