জাতিসংঘের ৩১তম জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন (COP31)-এ অংশগ্রহণ করতে তুরস্কের আনতালিয়ায় যাচ্ছেন নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার এস. এম. ফয়েজ উদ্দিন এবং উপজেলা প্রকৌশলী ইয়াসির আরাফাত। আগামী ৯ থেকে ২০ নভেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত অনুষ্ঠিতব্য এ সম্মেলনে তাঁরা স্থানীয় পর্যায়ে জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো উন্নয়ন, স্থানীয়ভাবে পরিচালিত অভিযোজন কার্যক্রম, পরিবেশবান্ধব জনসেবা এবং জলবায়ু অর্থায়নের সম্ভাবনা তুলে ধরবেন।
নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলায় উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) উদ্যোগে বাস্তবায়িত বিভিন্ন জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রম এবং Climate Resilient Campus Initiative সম্মেলনে বিশেষভাবে উপস্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। শিক্ষা ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও পরিবেশবান্ধব, স্বাস্থ্যসম্মত ও দুর্যোগসহনশীল করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে নেওয়া এ উদ্যোগে নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, দুর্যোগ প্রস্তুতি, সবুজ অবকাঠামো এবং জলবায়ু সচেতনতা বৃদ্ধির মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
উল্লেখ্য, নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার নির্বাহী অফিসার ও উপজেলা প্রকৌশলীর সমন্বিত উদ্যোগে গৃহীত বিভিন্ন জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রম এবং Climate Resilient Campus Initiative ইতোমধ্যে সারা দেশে প্রশংসিত হয়েছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে সীমিত সম্পদ ও স্থানীয় সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে সরকারি প্রতিষ্ঠান ও জনসেবামূলক অবকাঠামোকে জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় আরও সক্ষম করে তোলা যায়, তার একটি বাস্তব উদাহরণ তুলে ধরা সম্ভব হবে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার এস. এম. ফয়েজ উদ্দিন বলেন, “এই সফর নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা তথা দেশের জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো উন্নয়ন ও Climate Resilient Campus Initiative-কে আরও বেগবান করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আমাদের স্থানীয় উদ্যোগগুলো তুলে ধরার পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা, আধুনিক প্রযুক্তি ও অর্থায়নের সুযোগ সম্পর্কে জানার এবং সেগুলো স্থানীয় উন্নয়ন কার্যক্রমে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হবে। আমরা চাই, স্থানীয় পর্যায়ের সফল উদ্যোগগুলো জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সম্প্রসারিত হোক এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় আরও কার্যকর ভূমিকা রাখুক।”
সম্মেলনে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে দক্ষিণ-দক্ষিণ ও ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতা (South-South and Triangular Cooperation) জোরদারের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হবে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ও ইথিওপিয়ার মধ্যে স্থানীয় পর্যায়ের জলবায়ু উদ্যোগ, প্রযুক্তি, অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা বিনিময়ের সম্ভাবনা তুলে ধরা হবে। COP31-এ অর্জিত অভিজ্ঞতা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে ২০২৭ সালে ইথিওপিয়ায় অনুষ্ঠেয় COP32-কে সামনে রেখে জলবায়ু সহনশীল প্রতিষ্ঠান ও জনগোষ্ঠী গড়ে তোলার উদ্যোগ আরও বিস্তৃত করার বিষয়েও আলোচনা হতে পারে।
উপজেলা প্রকৌশলী ইয়াসির আরাফাত বলেন, “দুই বছর জার্মানির বন শহরে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক সচিবালয়ে (UNFCCC) CAPACITY Fellow হিসেবে Technology Subdivision-এ কাজ করার সুযোগ হয়েছে। এ সময়ে জলবায়ু প্রযুক্তি, প্রযুক্তি হস্তান্তর, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনার বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় সরাসরি কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। পাশাপাশি জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন COP28 ও COP29-এ দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতাও রয়েছে। এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে COP31-এ বাংলাদেশের স্থানীয় পর্যায়ের জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো ও ক্যাম্পাস ইনিশিয়েটিভ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তুলে ধরতে এবং দেশের জন্য জলবায়ু অর্থায়ন, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির নতুন সুযোগ অনুসন্ধানে কাজ করতে চাই।”
এ ছাড়া সম্মেলনে বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন ও বিনিয়োগের নতুন সুযোগ অনুসন্ধানেও তাঁরা গুরুত্ব দেবেন। বিশেষ করে গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড (GCF), গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটি (GEF), অ্যাডাপটেশন ফান্ড এবং বহুপাক্ষিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা কীভাবে স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যায়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সুযোগ তৈরি হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বন্যা, জলাবদ্ধতা, অতিবৃষ্টি, তাপপ্রবাহ ও অন্যান্য পরিবেশগত ঝুঁকি মোকাবিলায় জলবায়ু সহনশীল সড়ক, সেতু, কালভার্ট, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল পুনরুদ্ধার, নিরাপদ পানি সরবরাহ এবং জনসেবামূলক অবকাঠামো উন্নয়নে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহায়তা আকর্ষণের সম্ভাবনা তুলে ধরা হবে। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে চিহ্নিত উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকে আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নের উপযোগী করে প্রস্তুত করা, প্রকল্পের অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সুফল মূল্যায়ন এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টির বিষয়েও আলোচনা করা হবে।
তাঁদের এ অংশগ্রহণের লক্ষ্য থাকবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার স্থানীয় জলবায়ু উদ্যোগগুলো তুলে ধরা, বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য জলবায়ু অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার সুযোগ অনুসন্ধান এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাকে স্থানীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় কাজে লাগানো। এর মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলাসহ দেশের জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো উন্নয়নে নতুন সহযোগিতার সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে।