একের পর এক মামলা ও হয়রানির অভিযোগ জিপার মোল্লা ও তাঁর দুই ছেলের বিরুদ্ধে, আতঙ্কে নারী-শিশুসহ একাধিক পরিবার।
যশোরের অভয়নগর উপজেলার হিদিয়া গ্রামে মাত্র তিন শতক জমির বিরোধকে কেন্দ্র করে একের পর এক মামলা, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও হয়রানির ঘটনায় কয়েকটি পরিবার চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। একটি মারধরের ঘটনায় দায়ের করা মামলার পর জিপার মোল্লা ও তাঁর দুই ছেলে সাইফুল ইসলাম এবং সবুজ মোল্লার বিরুদ্ধে স্থানীয় একাধিক পরিবারের সদস্যদের হয়রানিমূলক মামলা দিয়ে বিপাকে ফেলার অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, কখনো থানায়, আবার কখনো আদালতে মামলা করে তাঁদের হয়রানি করা হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মামলার বাদী সবুজ মোল্লা। সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঘটনার সূত্রপাত তিন শতক জমির মালিকানা ও দখল নিয়ে বিরোধের জেরে। অভিযোগ রয়েছে, গত ২১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে হিদিয়া গ্রামের জিপার মোল্লা, তাঁর দুই ছেলে সাইফুল ইসলাম ও সবুজ মোল্লাসহ আরও ৪-৫ জন পার্শ্ববর্তী হালিম মোল্লার স্ত্রীকে মারধর করেন। এতে তাঁর বাম হাত ভেঙে যায় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। চিকিৎসা শেষে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি ভুক্তভোগী অভয়নগর থানায় জিপার মোল্লা ও তাঁর দুই ছেলের নাম উল্লেখ করে মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় অভিযুক্তরা বিজ্ঞ আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পর স্থানীয় একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে পৃথক মামলা দায়ের করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দাবি, এসব মামলার কয়েকটির ঘটনার সঙ্গে তাঁদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এমনকি মামলায় বর্ণিত ঘটনাগুলো আদৌ ঘটেনি বলেও দাবি করেছেন স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি। ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যের প্রত্যয়নপত্র অভিযোগের বিষয়টি আরও গুরুত্ব পেয়েছে শুভরাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও হিদিয়া ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্যের দেওয়া একটি লিখিত প্রত্যয়নপত্রকে কেন্দ্র করে। ভুক্তভোগীদের দাবি, আদালতে উপস্থাপনের জন্য দেওয়া ওই প্রত্যয়নপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, জিপার মোল্লা, সাইফুল ইসলাম ও সবুজ মোল্লার দায়ের করা কয়েকটি মামলায় বর্ণিত ধরনের কোনো ঘটনা সংশ্লিষ্ট ঘটনাস্থলে ঘটেনি। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের এমন প্রত্যয়নপত্রের পরও মামলার জটিলতা থেকে মুক্তি না পাওয়ায় ভুক্তভোগী পরিবারগুলো হতাশ হয়ে পড়েছে। তাঁদের অভিযোগ, গ্রামের মানুষ একাধিকবার সালিশ-বৈঠকের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি এবং মামলাগুলো প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়েছেন। কিন্তু মীমাংসার উদ্যোগ নিতে গিয়েও কেউ কেউ নতুন মামলার আসামি হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন। মোবাইলে ভিডিও করায় ১৩ বছরের শিশুও মামলার আসামি!
ভুক্তভোগীদের অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী সালমানের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের ঘটনা। মাত্র ১৩ বছর বয়সী সালমানের দাবি, একটি ঘটনার সময় মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করায় তাঁর প্রকৃত বয়স ২০ বছর দেখিয়ে সবুজ মোল্লা তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। সালমানের পরিবারের অভিযোগ, বয়সসংক্রান্ত এমন তথ্য দিয়ে একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীকে মামলার আসামি করায় সে মানসিকভাবে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। এদিকে এক সেনাসদস্যের অভিযোগ, চাকরির কারণে তিনি নিয়মিত গ্রামে থাকতে পারেন না। সংশ্লিষ্ট ঘটনার বিষয়ে কিছুই জানেন না, অথচ তাঁকেও মামলার আসামি করা হয়েছে। এতে তাঁর পেশাগত ও পারিবারিক জীবন নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বাড়ির ওপর গাছ পড়ে ক্ষতির অভিযোগ, প্রতিবাদ করলেই মামলার হুমকি
মামলার পাশাপাশি জমির সীমানা ঘেঁষে থাকা বড় বড় শিরীষগাছ নিয়েও নতুন বিরোধ তৈরি হয়েছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এসব গাছের ডালপালা ও গাছের অংশ তাঁদের বসতঘরের ওপর পড়ে ঘরবাড়ির ক্ষতি হচ্ছে। এ বিষয়ে কথা বলতে গেলে জিপার মোল্লা ও তাঁর ছেলেরা মামলা-হামলার হুমকি দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে ভয়ে কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছেন না। স্থানীয়দের দাবি, জমির বিরোধকে কেন্দ্র করে তাঁদের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে। একদিকে মামলার ভয়, অন্যদিকে বসতবাড়ির নিরাপত্তাহীনতা, সব মিলিয়ে পরিবারগুলো চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছে।
যেসব মামলায় আসামি করার অভিযোগ
ভুক্তভোগীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জিপার মোল্লা পরিবারের সদস্যদের বাদী করা কয়েকটি মামলার মধ্যে রয়েছে ১. অভয়নগর থানার মামলা নম্বর ১০, তারিখ ১৩ অক্টোবর ২০২৬। বাদী সবুজ মোল্লা। এ মামলায় আব্দুল হালিম (৫৮), নিজু মোল্লা, নাসিম মোল্লা, খান জাহান মোল্লা, সোনালী বেগম, ইউসুফ মোল্লা ও মো. সালমান মোল্লাকে আসামি করা হয়েছে বলে জানা গেছে। ২. বিজ্ঞ আদালতের সিআর মামলা নম্বর ৮৪৫/২৬। বাদী সবুজ মোল্লা। এ মামলায় মো. ইব্রাহিম মোল্লা, আব্দুল হালিম, মো. হিরু মোল্লা ও সোনালী বেগমকে আসামি করা হয়েছে।
৩. বিজ্ঞ আদালতের মামলা নম্বর ২১৪/২৬। বাদী হিদিয়া গ্রামের জিপার মোল্লার ছেলে মো. সাইফুল ইসলাম। এ মামলায় আব্দুল হালিমসহ ছয়জনকে আসামি করা হয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, এসব মামলার পেছনে মূল উদ্দেশ্য জমিসংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে তাঁদের চাপে রাখা ও হয়রানি করা। তাঁরা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং হয়রানিমূলক মামলা থেকে মুক্তি চান।
অভিযোগ অস্বীকার বাদী সবুজ মোল্লার
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার বাদী সবুজ মোল্লা বলেন, আমি যে মামলাগুলো করেছি, সেগুলোতে সত্য ঘটনা ঘটেছে। মূল ঝামেলা জমি নিয়ে। হালিম মোল্লা আমাদের জমি জোর করে দখল করে রাখতে চান। কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা আমাদের দেখতে পারেন না। আপনাদের যা ভালো মনে হয়, তা-ই করেন। এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, জমির বিরোধ কিংবা ব্যক্তিগত শত্রুতাকে কেন্দ্র করে কোনো নিরপরাধ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হন। অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত, প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে হিদিয়া গ্রামের দীর্ঘদিনের বিরোধের অবসান চান ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।