পৌরসভায় নাগরিক সেবায় হযবরল, নির্দিষ্ট কেন্দ্রেই অনলাইন আবেদনের অভিযোগ। যশোরের অভয়নগর উপজেলার নওয়াপাড়া পৌরসভায় নাগরিক সেবা প্রদানের নামে একটি নির্দিষ্ট তথ্যসেবা কেন্দ্রকে ঘিরে কথিত ‘সিন্ডিকেট’ গড়ে ওঠার অভিযোগ উঠেছে। জন্মনিবন্ধন, মৃত্যুনিবন্ধনসহ বিভিন্ন নাগরিক সেবা নিতে গিয়ে পৌরবাসীকে নির্দিষ্ট তথ্যসেবা কেন্দ্রের মাধ্যমে অনলাইন আবেদন করতে বাধ্য করা হচ্ছে—এমন অভিযোগ করেছেন একাধিক সেবাগ্রহীতা।
অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি বিভিন্ন নাগরিক সেবা অনলাইনে গ্রহণের সুযোগ থাকলেও নওয়াপাড়া পৌরসভায় বাস্তবে অনেক সেবার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা তথ্যসেবা কেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল হতে হচ্ছে। এতে একদিকে নাগরিকদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হচ্ছে, অন্যদিকে ভোগান্তি, হয়রানি ও সময়ক্ষেপণের শিকার হতে হচ্ছে তাদের।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র থাকলেও ‘নতুন ঝামেলা’
বিশেষ করে জন্মনিবন্ধনের ক্ষেত্রে সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নেওয়ার পাশাপাশি শিশুদের পৌরসভায় উপস্থিতি, বয়স নির্ধারণ ও বিভিন্ন যাচাই-বাছাইয়ের নামে অতিরিক্ত জটিলতা তৈরি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিকঠাক থাকার পরও কখনো কখনো আবেদন প্রক্রিয়ায় নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়। ফলে নাগরিকদের একাধিকবার পৌরসভায় যাতায়াত করতে হচ্ছে। পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধেও অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতাল থেকে শিশুদের দেওয়া টিকাদান কার্ডে উল্লেখিত বয়স পরিবর্তন করে দেওয়ার। নতুন করে জন্মনিবন্ধনের ক্ষেত্রে শিশুকে মায়ের সঙ্গে পৌরসভায় উপস্থিত থাকতে হয় বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন সেবাগ্রহীতা।
নিজের কম্পিউটার দোকান থেকে আবেদন করলেই আপত্তি? অভিযোগের আরেকটি গুরুতর দিক হলো, পৌরসভার নির্দিষ্ট তথ্যসেবা কেন্দ্রের বাইরে নিজের পছন্দের কম্পিউটার বা অনলাইন সেবা কেন্দ্র থেকে আবেদন করে নিয়ে এলে বিভিন্ন ভুলত্রুটি দেখিয়ে সেটি গ্রহণ না করে আবার পৌরসভার নির্দিষ্ট তথ্যসেবা কেন্দ্র থেকে আবেদন করার পরামর্শ দেওয়া হয়। এতে নাগরিকদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, সরকার যেখানে অনলাইনে নাগরিক সেবা গ্রহণের সুযোগ উন্মুক্ত করেছে, সেখানে একটি নির্দিষ্ট তথ্যসেবা কেন্দ্রের মাধ্যমেই কেন আবেদন করতে হবে? মায়ের মৃত্যুনিবন্ধন করতেও ভোগান্তি
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী জানান, তাঁর মায়ের মৃত্যুনিবন্ধন করতে গেলে প্রথমে জন্মনিবন্ধনের ভুল সংশোধন ও ইংরেজি করার পরামর্শ দেওয়া হয় তথ্যসেবা কেন্দ্র থেকে।
পরে তিনি পৌরসভার বাইরে একটি কম্পিউটার দোকান থেকে অনলাইনে আবেদন করে নিয়ে আসেন। তাঁর অভিযোগ, পৌর তথ্যসেবা কেন্দ্রের রাসেল ও মিরা আবেদনটি গ্রহণ করেননি। এমনকি পৌরসভার টিকাদানকারী মদিনা মনোয়ারের কম্পিউটার থেকে আবেদনটির কপি মুছে ফেলতে বাধ্য করা হয়। ওই ভুক্তভোগীর দাবি, পরে কোনো রশিদ না দিয়ে তাঁর কাছ থেকে ১০০ টাকা নেওয়া হয় এবং তথ্যসেবা কেন্দ্রের মাধ্যমে নতুন করে আবেদন করে সেটি পৌরসভার দ্বিতীয় তলায় জমা দিতে বলা হয়। দ্বিতীয় তলায় কাগজপত্র জমা দিতে গিয়েও তিনি নানা বিড়ম্বনার মুখে পড়েন। একপর্যায়ে আবেদন জমা না দিয়েই ফিরে আসেন বলে জানান তিনি। তথ্যসেবা কেন্দ্র থেকে অনলাইন আবেদন না করলে সেবাগ্রহীতাদের ফাইল গ্রহণ করা হয় না—এমন অভিযোগের বিষয়ে নওয়াপাড়া পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, “সাবেক মেয়র থাকাকালীন এ ধরনের নিয়ম চালু ছিল। এখন যে কোনো স্থান থেকে অনলাইন আবেদন করে আনতে পারে। তবে কাগজপত্র সঠিক থাকতে হবে।”
তবে নতুন জন্মনিবন্ধন কিংবা পুরোনো জন্মনিবন্ধনের ভুল সংশোধনের ক্ষেত্রে মায়ের সঙ্গে শিশুকে পৌরসভায় উপস্থিত থাকতে বাধ্য করা হচ্ছে, এমন অভিযোগের বিষয়ে তিনি সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। অন্য পৌরসভায় নেই এমন বাধ্যবাধকতা পার্শ্ববর্তী কয়েকটি পৌরসভায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জন্মনিবন্ধনসহ সংশ্লিষ্ট নাগরিক সেবার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো তথ্যসেবা কেন্দ্রের মাধ্যমে অনলাইন আবেদন করতে সেবাগ্রহীতাদের বাধ্য করা হয় না। অন্য একটি পৌরসভার টিকাদান সুপারভাইজার জানান, অনেক ক্ষেত্রেই আবেদনকারীর পরিবারের যেকোনো সদস্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে আবেদন জমা দিতে পারেন। শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে অনেক সময় তাদের পৌরসভায় উপস্থিত না করতেও বলা হয়। পাঁচজনের তথ্যসেবা কেন্দ্র, বেতন আসে কোন খাত থেকে? প্রত্যক্ষদর্শী আল আমিন বলেন, কাজের প্রয়োজনে যশোরের বেশ কয়েকটি পৌরসভায় যাওয়ার সুযোগ হয়েছে তাঁর। সেখানে সাধারণত দুজন করে তথ্যসেবা কেন্দ্রে কাজ করতে দেখেছেন তিনি। তবে নওয়াপাড়া পৌরসভার চিত্র ভিন্ন। তাঁর দাবি, এখানে তথ্যসেবা কেন্দ্রে মোট পাঁচজন কাজ করেন। প্রশ্ন উঠেছে, এই পাঁচজনের বেতন-ভাতা কোন খাত থেকে দেওয়া হয় এবং তাদের নিয়োগের প্রক্রিয়াই বা কী?
এই বিষয়টিও তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা।
‘নির্দিষ্ট কেন্দ্রনির্ভরতা’ নিয়ে প্রশ্ন
নওয়াপাড়ার সুধী সমাজের প্রতিনিধিদের প্রশ্ন, সরকার যখন অধিকাংশ নাগরিক সেবা অনলাইনের মাধ্যমে গ্রহণের সুযোগ দিয়েছে, তখন নওয়াপাড়া পৌরসভার নাগরিকদের কেন একটি নির্দিষ্ট তথ্যসেবা কেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল হতে হবে?
তাদের মতে, নাগরিকদের পছন্দ অনুযায়ী যেকোনো কম্পিউটার বা অনলাইন সেবা কেন্দ্র থেকে আবেদন করার সুযোগ থাকা উচিত। একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্রকে ঘিরে নির্ভরশীলতা তৈরি হলে সেখানে অনিয়ম, অতিরিক্ত অর্থ আদায় কিংবা স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো বিষয় রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
তদন্তের দাবি স্থানীয় ভুক্তভোগী ও সচেতন মহল নওয়াপাড়া পৌরসভার তথ্যসেবা কেন্দ্রের কার্যক্রম তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে, তথ্যসেবা কেন্দ্রের কার্যক্রম ও অনুমোদনের বৈধতা যাচাই;
নাগরিকদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থের হিসাব পরীক্ষা; টাকা গ্রহণের রশিদ দেওয়া হয় কি না, তা যাচাই; অনলাইন আবেদনের তথ্য ও লেনদেনের হিসাব পর্যালোচনা; আবেদনকারীদের ফাইল গ্রহণের প্রকৃত প্রক্রিয়া তদন্ত; তথ্যসেবা কেন্দ্রের কর্মীদের নিয়োগ ও বেতন-ভাতার উৎস যাচাই;
কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তথ্যসেবা কেন্দ্র সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা হয়রানির অভিযোগ তদন্ত।
অভিযোগগুলো তদন্তে প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি নাগরিক সেবায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও হয়রানিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
নওয়াপাড়া পৌরসভার তথ্যসেবা কেন্দ্রকে ঘিরে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে অভয়নগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক শেখ সালাউদ্দীন দিপুর সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক মো. রফিকুল হাসানের মোবাইল ফোনেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তিনিও ফোন ধরেননি।
ফলে তথ্যসেবা কেন্দ্রকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সরকার বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এখন প্রশ্ন একটাই, নাগরিক সেবা সহজ করার জন্য তৈরি তথ্যসেবা কেন্দ্রই যদি নাগরিক ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে এর দায় নেবে কে?