ককটেল হামলায় যুবক শামীম খুনের ৯ মাস পর আবারও আকুন্জি বাহিনীর বোমা ও গুলি তাণ্ডব; আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন।
যশোরের অভয়নগরে যেন আইন নিজেই অসহায় হয়ে পড়েছে! একটি চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার প্রধান আসামি উচ্চ আদালত বা নিম্ন আদালত, কোনো জায়গা থেকে জামিন না নিয়েই দীর্ঘ ৯ মাস ধরে প্রশাসনের নাকের ডগায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর এই বিচারহীনতার সংস্কৃতির চরম মূল্য দিতে হলো শুভরাড়া এলাকার কৃষক মিজান গাজীকে। খুনের মামলার সেই চিহ্নিত প্রধান আসামি মিজানুর রহমান আকুন্জি ও তার বাহিনী গতকাল শনিবার (৪ জুলাই) সন্ধ্যায় প্রকাশ্য দিবালোকে মিজান গাজীকে লক্ষ্য করে ফিল্মি কায়দায় গুলি ও ভয়াবহ বোমা হামলা চালিয়েছে। অলৌকিকভাবে গুলি থেকে বেঁচে গেলেও বোমার আঘাতে শরীর ও পা ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় এখন খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (খুমেক) এ চিকিৎসাধীন রয়েছে তিনি।
শনিবার মাগরিবের আজানের ২০ মিনিট আগে (সন্ধ্যা আনুমানিক সাড়ে ৬টা) শুভরাড়া এলাকার স্বপনের বাড়ির সামনে এই লোমহর্ষক ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর থেকে পুরো অভয়নগর জুড়ে চরম আতঙ্ক, ক্ষোভ ও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
পারিবারিক ও ভুক্তভোগী মিজান গাজী থেকে জানাযায়, গতকাল বিকেলে মিজান গাজী বাজার করার জন্য বাসুয়াড়ি বাজারে গিয়েছিলেন। সন্ধ্যা নামার মুখে তিনি যখন বাড়ি ফিরছিলেন, তখন শুভরাড়া এলাকার স্বপনের বাড়ির সামনে দুটি মোটরসাইকেলে চড়ে এসে ওত পেতে থাকা ৫ জনের একটি সশস্ত্র দল তাঁর গতিপথ রোধ করে।
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে অবরুদ্ধ কণ্ঠে আহত মিজান গাজী জানান, হামলাকারীদের নেতৃত্বে ছিল এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও শামীম হত্যা মামলার প্রধান আসামি মিজানুর রহমান আকুন্জি। তার সাথে ছিল ইনদা, মুসা এবং আরও দুই অজ্ঞাতনামা ভাড়াটে খুনি। মোটরসাইকেল থেকে নেমেই মিজানুর আকুন্জি মিজান গাজীকে লক্ষ্য করে সরাসরি গুলি বর্ষণ করে। মিজান গাজী জীবন বাঁচাতে উল্টো দিকে দৌড় দিলে গুলিটি তাঁর গায়ের পাশ দিয়ে চলে যায়।
ব্যর্থ হয়ে খুনি আকুন্জি তার হাতে থাকা শক্তিশালী বোমা মিজান গাজীকে লক্ষ্য করে ছুঁড়ে মারে। বিকট শব্দে বোমাটি বিস্ফোরিত হলে মিজান গাজীর পায়ের গোড়ালি চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। এরপর হামলাকারীরা তাঁকে ‘মৃত’ ভেবে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। পরে স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান, অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাঁর ক্ষতবিক্ষত পা থেকে জালের কাঠি (বোমার স্প্লিন্টার) সহ বোমার বিভিন্ন বিস্ফোরক উপাদান বের করা হয়েছে। প্রচুর রক্তক্ষরণ হলেও বর্তমানে তিনি আশঙ্কামুক্ত। অতীতেও আকুন্জি বাহিনীর বলি হয়েছিল যুবক শামীম। অনুসন্ধানে জানা গেছে, গতকালের হামলার শিকার মিজান গাজীর বাড়িতে এর আগেও হামলা চালিয়েছিল এই আকুন্জি বাহিনী। গত বছরের ৩ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক ১০টার দিকে শুভরাড়া (বাবুরহাট) এলাকায় মোবাইলে গেম খেলাকে কেন্দ্র করে পূর্ব শত্রুতার জেরে সংঘবদ্ধ হামলা চালায় মিজানুর রহমান আকুন্জি ও তার দল। সে সময় শামীম শেখ (২০) নামের এক যুবককে প্রথমে মারধর ও পরে কপালে অস্ত্র ঠেকিয়ে সরাসরি গুলি করে আকুন্জি।
গুলি করার পর পালিয়ে যাওয়ার সময় এই মিজান গাজীর বাড়ি লক্ষ্য করেই পরপর বেশ কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল সন্ত্রাসীরা। গুলিতে গুরুতর আহত শামীম শেখকে খুমেক হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। জামিন ছাড়াই ৯ মাস মুক্ত খুনের আসামি! শামীম হত্যাকাণ্ডের পর নিহতের পিতা মোঃ ওহিদুল শেখ বাদী হয়ে অভয়নগর থানায় দণ্ডবিধির ৩০২/৩০৭/৩৪ ধারায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন (মামলা নং-৭, তারিখ: ০৬/০৯/২০২৫ ইং)। এই মামলার ১ নম্বর ও প্রধান আসামি করা হয় মিজানুর রহমান আকুন্জিকে। মামলার পর ৯ মাস পার হয়ে গেলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এই প্রধান আসামিকে গ্রেফতার করতে পারেনি। অথচ স্থানীয়দের অভিযোগ, কোনো আদালত থেকে জামিন না নিয়েই মিজানুর রহমান আকুন্জি এলাকায় বুক ফুলিয়ে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং বীরদর্পে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলো চরম নিরাপত্তাহীনতায়,খুনের মামলার প্রধান আসামি প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ানো এবং একের পর এক নতুন হামলা চালানোয় চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছে নিহতের পরিবারসহ স্থানীয় সাধারণ মানুষ। নিহত শামীমের পিতা ওহিদুল শেখ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমার ছেলেকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমরা বুক ফেটে বিচার চাচ্ছি। কিন্তু মামলার বয়স ৯ মাস পার হলেও প্রধান আসামি গ্রেফতার না হয়ে উল্টো এলাকায় ঘুরে আমাদেরই প্রতিনিয়ত ভয়ভীতি ও হুমকি দিচ্ছে। আমরা এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। স্থানীয়দের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃশ্যমান কোনো তৎপরতা বা সদিচ্ছা না থাকায় আসামিরা দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। খুনের মামলার প্রধান আসামিকে দ্রুত গ্রেপ্তার করা হলে হয়তো গতকাল মিজান গাজীকে এই নির্মমতার শিকার হতে হতো না। সাধারণ মানুষের মনে এখন একটাই বড় প্রশ্ন, খুনের মতো গুরুতর মামলার প্রধান আসামি কীভাবে দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায় এবং পুনরায় নতুন করে মানুষের ওপর গুলি ও বোমা হামলার সাহস পায়? এলাকায় শান্তি ফিরিয়ে আনতে অবিলম্বে এই সন্ত্রাসী বাহিনীকে আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছেন অভয়নগরবাসী। এবিষয়ে অভিযুক্ত মিজানুর রহমান আকুন্জির সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। ফলে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। এবিষয়ে অভয়নগর থানার পুলিশ পরিদর্শক তদন্ত জাহিদুল ইসলাম বলেন, ঘটনা সংবাদ পেয়ে পুলিশ পাঠানো হয়েছে, তদন্ত করে দেখা হচ্ছে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থাগ্রহণ করা হবে।