স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এই অঞ্চলের লোকনাট্যাঙ্গনকে সমৃদ্ধ করতে ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ঐতিহ্যবাহী যাত্রাদল ‘রূপশ্রী অপেরা’। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে গৌরবময় দলটি সফলতার ৫০ বছর (সুবর্ণজয়ন্তী) পূর্ণ করেছে। এই ঐতিহাসিক উপলক্ষকে স্মরণীয় করে রাখতে দলটির প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত বাবু খগেন্দ্র নারায়ণ লস্করের পৈতৃক নিবাস—ভাটকৈ গ্রামের লস্কর বাড়ির উঠানে তাঁর পরিবার ও স্থানীয়দের যৌথ উদ্যোগে বসেছিল এই বিশেষ আসর। এতে স্থানীয় শিল্পীদের নিপুণ অভিনয়ে মঞ্চস্থ হয় যুগোপযোগী যাত্রাপালা ‘এই পৃথিবী টাকার গোলাম’।
আরও জানা যায় ৭০-এর দশকে এই রূপশ্রী অপেরা গড়ে তোলার পেছনে খগেন্দ্র নারায়ণ লস্করের সাথে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন প্রয়াত অখিল সেন এবং খগেন্দ্র নারায়ণের দ্বিতীয় স্ত্রী। প্রবীণদের মতে, সে সময় এই যাত্রাপালা থেকে উপার্জিত অর্থ দিয়ে এলাকার বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও সামাজিক-ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হতো। ৩ জুন বুধবার থেকে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার ৫জুন পর্যন্ত তিন দিনব্যাপী এই আয়োজনে সাধারণ দর্শকের পাশাপাশি যোগ দেন গুণীজনেরাও।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘নওগাঁ একুশে পরিষদ’-এর সাধারণ সম্পাদক, বিশিষ্ট গবেষক ও লেখক মোস্তফা আল-মেহমুদ রাসেল, কার্যনির্বাহী সদস্য আজিজুর রহমান খান, পত্নীতলার যাত্রাশিল্পী আশরাফুল ইসলাম এবং খগেন্দ্র নারায়ণের সহযোদ্ধা প্রবীণ নাট্যকর্মী বাবু সন্তোষ কুমার দাসসহ সাংস্কৃতিক প্রেমী অনেকেই।
গবেষক মোস্তফা আল-মেহমুদ রাসেল বলেন, “অপসংস্কৃতির হাত থেকে তরুণ সমাজকে বাঁচাতে মাঠপর্যায়ে সুস্থ ও রুচিশীল বিনোদনের বিকল্প হিসেবে যাত্রাশিল্পের পুনরুজ্জীবন ঘটানো অত্যন্ত জরুরি।” ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পমাধ্যমকে টিকিয়ে রাখতে তিনি অনতিবিলম্বে সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক অনুদানের জোর দাবি জানান। উল্লেখ্য, রূপশ্রী অপেরার এই দীর্ঘ পথচলা নিয়ে তিনি ‘রূপশ্রী অপেরা’ নামে একটি গবেষণামূলক গ্রন্থও রচনা করেছেন।
সাংস্কৃতিকপ্রেমী ও স্থানীয় বাসিন্দা রবিউল ইসলাম জানান, “এই আয়োজন গ্রামীণ সংস্কৃতির এক অনন্য পুনর্জাগরণ। যাত্রাপালার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে নৈতিক মূল্যবোধ ও দেশপ্রেমের যে বার্তা দেওয়া হয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। সমাজ গঠনে এই লোকশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে আমাদের সবার একযোগে এগিয়ে আসা উচিত।”
ভাটকৈ গ্রামের প্রবীণ লস্কর বাড়ির উঠানে নতুন করে যাত্রাপালার সুর ভেসে আসায় মেতে উঠেছিল পুরো এলাকা।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই আয়োজন কেবল বিনোদনই জোগায়নি, বরং গ্রামীণ সৌহার্দ্য, অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং গুণীজনদের মূল্যায়নের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।