বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬, ০১:৪৬ পূর্বাহ্ন

হারিয়ে যাওয়া নিরাপত্তা, এক অন্ধকার সময়ের ভিতর আমাদের শিশুরা- এস এম মাসুদ রানা

চলনবিলের আলো ডেস্ক:
আপডেট সময়: বুধবার, ২০ মে, ২০২৬, ১১:৪৬ অপরাহ্ন

রাত গভীর হলে একসময় গ্রামের পথ নিস্তব্ধ হয়ে যেত। দূরে বাঁশঝাড়ে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, উঠোনে মায়ের কাঁথা সেলাই, আর শিশুর নিশ্চিন্ত ঘুম এটাই ছিল বাংলার চিরচেনা ছবি। শহরেও ব্যস্ত দিনের শেষে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাবা ভাবতেন, “আমার সন্তান নিরাপদ আছে।”

কিন্তু আজ সেই নিশ্চিন্ততার আকাশে যেন অদৃশ্য কালো মেঘ জমেছে। কি গ্রামে, কি শহরে, বাসে, স্কুলে, আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে কোথাও যেন পুরোপুরি নিরাপদ নয় নারীরা, নিরাপদ নয় আমাদের আগামী দিনের ভবিষ্যত আমাদের কমলমতি শিশুরা। প্রতিদিন চোখ মিললে দেখা যায় খবরের পাতায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। অথবা সামাজিক আড্ডায় চায়ের দোকানে ফিসফাসে উঠে আসে নির্মম কিছু গল্প। এমন গল্প, যা শুধু কেবল মাত্র একটি মানুষকে নয়, পুরো সমাজকেই আহতের তলদেশে নিয়ে যায়। আমরা কেমন সময়ের মধ্যে বাস করছি? চারপাশে মানুষ আছে, কিন্তু মানুষের ভেতরের মানবিকতা কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে? যে শিশুটি পুতুল নিয়ে খেলবে, মুক্ত সবুজ ঘাসে দৌড়াবে নীলআকাশে ঘুড়ি ওড়াবে, সে কেন আজ ভয় নিয়ে বড় হবে? দারুণ কষ্ট লাগে, ক্ষত করে হৃদয়কে। একটি শিশু মায়ের নাড়ী ছিঁড়ে পৃথিবীতে আসে বিশ্বাস নিয়ে। সে হয়তো তার শিশু মনে ভাবে ধরণীটা কত সুন্দর।
সে একটু বড় হলে ভাবে সমাজের বড়রা তাকে রক্ষা করবে।
কিন্তু যখন সেই বড়দের মধ্যেই কেউ বিকৃত মানসিকতার অন্ধকার বহন করে, তখন সমাজের ভিত কেঁপে ওঠে, কেঁপে উঠে প্রকৃতি পুরো পৃথিবী! একটি শিশুর কান্না তখন শুধু মাত্র একটি পরিবারের নয় বরং পুরো জাতির ব্যর্থতার প্রতিধ্বনি হয়ে ওঠে।

আজকের এই বাস্তবতা কেবল আইন দিয়ে থামানো যাবে না, যদি না মানুষের সেই বিবেক জেগে ওঠে। কারণ ধর্ষণ শুধু শরীরের বিরুদ্ধে অপরাধ নয়, এটি সভ্যতার বিরুদ্ধেও আঘাত। এটি বিশ্বাসকে হত্যা করা । এটি ভবিষ্যৎকে ভীত করে তোলা এক নীরব যুদ্ধ।

আমরা প্রযুক্তিতে এগিয়ে হয়তো উঁচু ভবন গড়েছি, আধুনিকতার গল্প লিখেছি অথচ মানুষের মন যদি অন্ধকারে ডুবে থাকে, তবে সেই উন্নয়ন তো অসম্পূর্ণ।
একটি সমাজ তখনই সত্যিকারের সভ্য হয়ে উঠে, যখন নারী ও শিশুরা নিরাপদে প্রাণ খুলে হাসতে পারে।

আজ প্রয়োজন পরিবারে মানবিক শিক্ষা, বিদ্যালয়ে নৈতিকতার চর্চা, সাহিত্য চর্চা, সমাজিক সচেতনতা এবং দ্রুত বিচার। একজন শিশু যেন সাহস করে বলতে পারে— “আমি ভয় পাই না।”
একজন নারী যেন দিন এবং রাতে পথ চলতে গিয়ে আতঙ্কে পেছনে ফিরে না তাকায়। সর্বপরি আমাদের মনে রাখতে হবে, শিশুরা শুধু আগামী দিনের নাগরিক নয়, তারা আগামী দিনের তাজা স্বপ্ন। তাদের চোখে যদি ভয় জন্মায়, তবে ভবিষ্যতের আকাশও বোধ করি অন্ধকার হয়ে যাবে।

তাই এখনই সময়— প্রতিবাদকে অভ্যাসে পরিণত করার, নীরবতা ভাঙার, বিকৃত মানসিকতার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার। একটি নিরাপদ শিশু মানেই একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ। আর কেবল মানবিক মানুষে ভরা সমাজই পারে এই ঘোর অন্ধকার সময়কে আলোয় ফিরিয়ে আনতে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর পড়ুন
এক ক্লিকে বিভাগের খবর