শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২৬, ০১:৩২ পূর্বাহ্ন

নিষেধাজ্ঞা নয়, সুশাসিত ব্যবস্থাপনা;বাংলাদেশের করনীতি ও পলিথিন বাস্তবতা- সাজিদুর রহমান সুমন

চলনবিলের আলো ডেস্ক:
আপডেট সময়: শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২৬, ০১:৩২ পূর্বাহ্ন

নিষেধাজ্ঞা নয়, সুশাসিত ব্যবস্থাপনা—বাংলাদেশের করনীতি ও পলিথিন বাস্তবতা বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, ব্যবসা-বাণিজ্যের বিস্তার এবং উদ্যোক্তা সৃষ্টির ক্ষেত্রে দেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। দেশের বাজারে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন ব্যবসা গড়ে উঠছে, মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যে বাণিজ্য করছে, এবং রাষ্ট্রও এ থেকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আহরণ করছে। কিন্তু এই সম্ভাবনার মধ্যেও একটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে—কর ও মূসক (ভ্যাট) আদায়ের অসমতা এবং অনিয়ম। বাস্তবতা হলো, কিছু প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নিয়মিত কর প্রদান করলেও অনেকেই বিভিন্ন উপায়ে কর ফাঁকি দিচ্ছে বা কম পরিশোধ করছে। এর পেছনে রয়েছে দুর্বল তদারকি, অসাধু যোগসাজশ এবং কর ব্যবস্থার জটিলতা। ফলে রাষ্ট্র যে পরিমাণ রাজস্ব পাওয়ার কথা, তার একটি বড় অংশ অনাদায়ী থেকে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি শুধু অর্থনীতির ক্ষতিই করছে না, বরং সৎ করদাতাদের জন্যও এক ধরনের অবিচার তৈরি করছে। অন্যদিকে, নতুন উদ্যোক্তা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য কর ব্যবস্থা অনেক সময় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। একটি টেকসই অর্থনীতির জন্য প্রয়োজন উদ্যোক্তাবান্ধব নীতি, যেখানে নতুন ব্যবসাকে উৎসাহ দিতে কর ছাড়, সহজ নিবন্ধন প্রক্রিয়া এবং নিম্নহারের ট্যাক্স সুবিধা দেওয়া হবে। এতে একদিকে যেমন নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে করদাতার সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। এখন আসা যাক আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে—ক্ষতিকর পণ্যে করনীতি। তামাকজাত দ্রব্য যেমন সিগারেট, জর্দা, গুল ইত্যাদি আমাদের স্বাস্থ্য ও সমাজের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। একইভাবে কিছু ভোগ্যপণ্য পরিবেশের জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ধরনের পণ্যে উচ্চহারে কর আরোপ করা শুধু রাজস্ব বৃদ্ধির উপায় নয়, বরং জনস্বাস্থ্য রক্ষার একটি কার্যকর কৌশল। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং বাস্তবসম্মত আলোচনার দাবি রাখে পলিথিন ইস্যুটি। বহু বছর ধরে পলিথিন নিষিদ্ধ থাকলেও বাস্তবে এর ব্যবহার বন্ধ করা যায়নি। বরং এটি এখন আরও অনিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং পরিবেশ দূষণের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর না হওয়ার কারণে আমরা সমস্যার সমাধান করতে পারছি না, বরং সমস্যাটি আরও জটিল হয়ে উঠছে। এই প্রেক্ষাপটে একটি বাস্তবমুখী সমাধান হতে পারে—পলিথিনকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ না রেখে বৈধ বাণিজ্যিক কাঠামোর মধ্যে আনা। এর উপর উচ্চহারে কর আরোপ করা যেতে পারে, যা থেকে বছরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব (সম্ভাব্য ২৫-৩০ হাজার কোটি টাকা) অর্জন সম্ভব। একইসাথে কঠোর আইন প্রয়োগ করে ব্যবহারের পর যত্রতত্র ফেলে দিলে জরিমানা বা দণ্ডের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, পলিথিন রিসাইক্লিং ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা। দেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে থাকা পলিথিন সংগ্রহ করে পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব। একটি উপজেলা থেকেই যদি প্রতিদিন ৩০০-৪০০ কেজি পলিথিন সংগ্রহ করা যায়, তাহলে জাতীয় পর্যায়ে এর পরিমাণ কত হতে পারে, তা সহজেই অনুমান করা যায়। এই বিশাল পরিমাণ বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করা গেলে একদিকে পরিবেশ রক্ষা পাবে, অন্যদিকে নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। সুতরাং, শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন বাস্তবসম্মত নীতি, কার্যকর তদারকি এবং জনসচেতনতা। কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে হবে, অসাধু চক্র ভাঙতে হবে এবং একইসাথে পরিবেশবান্ধব অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আমাদের নীতিনির্ধারণের উপর। সময় এসেছে আবেগ নয়, যুক্তি ও বাস্তবতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার—যেখানে রাষ্ট্র, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ মানুষ সবাই উপকৃত হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর পড়ুন
এক ক্লিকে বিভাগের খবর