শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৪১ অপরাহ্ন

অভয়নগরে ভৈরব নদ দখলে প্রভাবশালীদের প্রতিযোগিতা, কর্মহীন হয়ে পড়ছে মানুষ

মোঃ কামাল হোসেন, অভয়নগর(যশোর):
আপডেট সময়: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ৭:২৮ অপরাহ্ন

নাব্যতা সংকটে ঝুঁকিতে নওয়াপাড়া শিল্পনগর, হুমকিতে শত শত বিঘা ফসলি জমি অর্ধশতাধিক ঘাট ঘিরে দখলের অভিযোগ, সরকারি রাজস্ব হারানোর আশঙ্কা। যশোরের অভয়নগরের ভৈরব নদ ঘিরে দখলের প্রতিযোগিতা ক্রমেই বাড়ছে। নদীর নাব্যতা সংকটকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী, ঘাট ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিকের বিরুদ্ধে নদীর জায়গা দখল করে কৃত্রিম চর, ঘাট ও গুদাম নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি কোথাও কোথাও নদীর বাঁক পরিবর্তন এবং অপর পাড়ে তীব্র ভাঙনের সৃষ্টি হচ্ছে। ভাঙনে শত শত বিঘা ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বহু পরিবার।

নদী দখল ও অবৈধ স্থাপনা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর তদারকির অভাবে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, ভৈরব নদের নাব্যতা সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের অন্যতম বৃহৎ ব্যবসায়িক মোকাম নওয়াপাড়ার শিল্প-বাণিজ্য মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। তবে নদী দখল রোধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে নওয়াপাড়া নদীবন্দর কর্তৃপক্ষ। উপজেলা প্রশাসনও সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধি ও অবৈধ দখল বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে। ১৫ কিলোমিটার নদীবন্দরজুড়ে দখলের অভিযোগ নওয়াপাড়া দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক মোকাম। নৌ, সড়ক ও রেলপথের যোগাযোগব্যবস্থার কারণে দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলে সার, সিমেন্ট, খাদ্যশস্যসহ বিভিন্ন পণ্যের বড় বাজার গড়ে উঠেছে। উপজেলার রাজঘাট থেকে বসুন্দিয়া ইউনিয়নের আফ্রা ঘাট পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত নওয়াপাড়া নদীবন্দর।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এই নদীবন্দর এলাকার বিভিন্ন স্থানে নদীর জায়গা ভরাট করে ঘাট, গুদাম ও অন্যান্য স্থাপনা গড়ে তোলা হচ্ছে। কোথাও বাঁশ, কাঠ ও টিনের বেড়া দিয়ে নদীর অংশ আটকে মাটি-বালু ফেলে কৃত্রিম চর তৈরি করা হচ্ছে। এতে নদীর প্রবাহ ও নৌযান চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।

সরেজমিনে নদীর জায়গা ভরাটের চিত্র

সরেজমিনে নওয়াপাড়া নদীবন্দরের ভাঙ্গাগেট এলাকার মশরহাটি গ্রামে ভৈরব সেতুর আশপাশে নদীর জায়গা ভরাটের চিত্র দেখা যায়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীতীরবর্তী ‘পরশ আটা, ময়দা, সুজি মিল’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান নদীর প্রায় ১০০ ফুট অংশ দখলে নিয়ে মাটি ভরাট করছে। প্রথমে কৃত্রিম চর তৈরি করে পরে লং বুম ব্যবহার করে সেখানে মাটি ফেলা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পাশেই ‘আক্তার এগ্রো’ নামের একটি বন্ধ কারখানার বিরুদ্ধেও নদীর বড় একটি অংশ দখলের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, বাঁশের খুঁটি ও পুরোনো টিন দিয়ে নদীর মধ্যে বাঁধ তৈরি করে পরে ইট, বালু, পাথর ও মাটি ফেলে জায়গাটি ভরাট করা হয়েছে। সেখানে ঘাট নির্মাণেরও চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এসব ভরাটের কারণে ওই স্থানে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ ও বাঁকে পরিবর্তন এসেছে। এর ফলে নদীর বিপরীত পাড়ে ভাঙন বেড়েছে এবং এখনো তা অব্যাহত রয়েছে।

এ ছাড়া তালতলা ঘাট, নূর সিমেন্ট ফ্যাক্টরি-সংলগ্ন ঘাট-গুদাম এবং মহাকাল-চেঙ্গুটিয়া এলাকার কয়েকটি ঘাট ও গুদাম নদীর ভেতরের দিকে বিস্তৃত হয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। এসব স্থাপনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ, নদী বাঁচলেই বাঁচবে নওয়াপাড়া

নওয়াপাড়া সার, সিমেন্ট ও খাদ্যশস্য ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক শাহজালাল হোসেন বলেন, “নওয়াপাড়ায় প্রায় ৪০০ ব্যবসায়ী রয়েছেন। নদী বাঁচাতে না পারলে এখানে ব্যবসা টিকবে না। ইতিমধ্যে গম ও চাল আসা কমে গেছে, কয়লা আসাও কমেছে। ব্যবসায়ীরা অন্যত্র চলে যাচ্ছেন।”

ব্যবসায়ীদের একাংশের দাবি, নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় ঘাটে জাহাজ ও কার্গো ভিড়তে সমস্যা হচ্ছে। এ কারণে কোথাও কোথাও মাটি ও বালু ফেলে এবং বাঁশ-কাঠের কাঠামো তৈরি করে পন্টুন স্থাপনের প্রয়োজন হচ্ছে। তবে নদীর নাব্যতা সংকটের কারণে ঘাট পরিচালনায় সমস্যা থাকলেও তা নদীর জায়গা দখল বা অনুমোদনহীন স্থাপনা নির্মাণের বৈধতা দেয় না। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন, নদীর সীমানা নির্ধারণ এবং আইনগত বিধিবিধান অনুসরণ জরুরি। বন্দরের ৯০ প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ, উচ্ছেদ ৫৯টি স্থাপনা নওয়াপাড়া নদীবন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, ২০০৭ সাল থেকে বন্দরের কার্যক্রম শুরু হয়। বর্তমানে বন্দরে নয়টি সরকারি জেটি রয়েছে। এ ছাড়া ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রায় ১০০টি ঘাট রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে রাজঘাট থেকে ভাঙ্গাগেট পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকায় গাইডওয়াল নির্মাণ, স্থায়ী জেটি স্থাপন এবং কাস্টমস ভবন নির্মাণের পরিকল্পনাসংবলিত প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। প্রস্তাবটি অনুমোদন ও বাস্তবায়িত হলে বন্দরের অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

নওয়াপাড়া নদীবন্দরের উপপরিচালক মাসুদ পারভেজ বলেন, স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ঘাটমালিকদের একটি অংশ অযথা নদীর নাব্যতা সংকটের অজুহাত দেখাচ্ছেন। ভৈরব সেতু-সংলগ্ন এলাকায় নদী খননের কাজ চলছে এবং এ কার্যক্রম সারা বছর অব্যাহত থাকবে। তিনি আরও বলেন, কৃত্রিমভাবে চর তৈরি করে যারা নদী দখল করছেন, তাঁদের তালিকা করে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। প্রায় ৯০টি প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫৯টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। বাকিগুলোর বিরুদ্ধে অচিরেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রশাসনের আশ্বাস, অবৈধ দখলে ছাড় নয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সালাউদ্দিন দীপু জানিয়েছেন, সরকারি রাজস্ব বাড়াতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অবৈধ দখল রোধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে এবং এ বিষয়ে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। স্থানীয়দের মতে, ভৈরব নদ শুধু নওয়াপাড়ার নৌপথ নয়; এটি এ অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি, পরিবেশ ও জীবিকার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। নদীর প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে একদিকে নৌযান চলাচল ও পণ্য পরিবহন ব্যাহত হবে, অন্যদিকে নদীভাঙনে কৃষিজমি ও বসতভিটা হারানোর ঝুঁকি বাড়বে। তাই নদীর প্রকৃত সীমানা নির্ধারণ, অবৈধ দখলদারদের তালিকা প্রকাশ, অনুমোদনহীন স্থাপনা উচ্ছেদ, নদী খনন এবং সরকারি ঘাটগুলোর রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল। তাঁদের মতে, কেবল নোটিশ ও আশ্বাসে সীমাবদ্ধ না থেকে নিয়মিত তদারকি এবং দৃশ্যমান আইনগত পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় ভৈরব নদের নাব্যতা সংকট ও দখলদারত্বের চাপ নওয়াপাড়ার শিল্প-বাণিজ্যের ভবিষ্যৎকে আরও অনিশ্চিত করে তুলতে পারে।


আপনার মতামত লিখুন :
এই বিভাগের আরও খবর পড়ুন
এক ক্লিকে বিভাগের খবর