মঙ্গলবার, ০৭ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৫৩ পূর্বাহ্ন

অভয়নগরে ভিপি খতিয়ানের নামে ‘জমি দখলের খেলা: ভূমি অফিসের ইকরাম আলীর দাপট

মোঃ কামাল হোসেন, অভয়নগর(যশোর):
আপডেট সময়: সোমবার, ৬ এপ্রিল, ২০২৬, ১০:০২ অপরাহ্ন

ঘুষের বিনিময়ে দখল বদলের চেষ্টা, ভুক্তভোগীদের ক্ষোভ, আইন কি কেবল কাগজে-কলমেই?

 

যশোরের অভয়নগর উপজেলা ভূমি অফিসে আবারও গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। বিতর্কিত ও মামলাধীন জমি তদন্তাধীন থাকা অবস্থাতেই ইজারা দেওয়ার অভিযোগে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন অফিসটির হেড অ্যাসিস্ট্যান্ট কাম-অ্যাকাউন্ট্যান্ট মো. ইকরাম আলী। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ঘুষের বিনিময়ে সরকারি নিয়ম ভেঙে জমির দখল বদলের অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, উপজেলার সিদ্ধিপাশা ইউনিয়নের সিদ্ধিপাশা মৌজার এসএ ২২৫৫ নম্বর খতিয়ানের ১৯২৩ দাগভুক্ত ৪২ শতক জমি মৃত মুক্তার গাজী ৫০৮ নম্বর কবলা দলিলের মাধ্যমে ক্রয় করে দীর্ঘদিন ভোগদখলে ছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্রের সঙ্গে যোগসাজশে অন্য একটি এসএ ২৩২৮ নম্বর খতিয়ানের ৪১ শতক জমিকে ভিপি খতিয়ানভুক্ত (ভিপি নং ৪৮৩/এএন/৬৮) দেখিয়ে জটিলতা তৈরি করা হয়। ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রকৃতপক্ষে এসএ ২২৫৫ নম্বর খতিয়ানের জমিই জালিয়াতির মাধ্যমে ভিপি খতিয়ানভুক্ত দেখানো হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তৎকালীন নায়েব প্রশান্ত সাহা ও সহকারী মাসুদের সম্পৃক্ততায় অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে এই কারসাজি করা হয় এবং পরে ফিরোজ গাজী নামের এক ব্যক্তির নামে ইজারা দেখিয়ে জমি দখলের পাঁয়তারা চালানো হয়।

 

মুক্তার গাজীর মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে রাজ্জাক গাজী জমি ফিরে পেতে আদালতের দ্বারস্থ হন। তিনি দেওয়ানি মামলা (নং ৭/২৪) দায়ের করেন এবং একই সঙ্গে উপজেলা ভূমি অফিসে লিখিত আবেদন দিয়ে চলতি বছরের ইজারা স্থগিত রাখার অনুরোধ জানান। বিষয়টি আমলে নিয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) তদন্তের নির্দেশ দেন। তদন্তভার পান ইউনিয়ন ভূমি অফিসের নায়েব মফিজুর রহমান। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, তদন্ত চলাকালেই মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে ইকরাম আলী বিতর্কিত এসএ ২৩২৮ নম্বর খতিয়ানের জমি ফিরোজ গাজীর নামে ইজারা দিয়ে ডিসিআর (দাখিলা) ইস্যু করেন। এমনকি কৌশলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার স্বাক্ষরও নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে ফের নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। অভিযোগ, ফিরোজ গাজী প্রকৃত জমির পরিবর্তে ভুক্তভোগীদের এসএ ২২৫৫ নম্বর খতিয়ানের জমি দখলের চেষ্টা করেন।

 

ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, আমাদের জমি কখনোই ভিপি খতিয়ানভুক্ত হয়নি। তবুও জোর করে ভিপি দেখিয়ে দখল নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। অথচ নিয়ম অনুযায়ী ভিপি জমির ক্ষেত্রে দখলদার ব্যক্তিই ইজারায় অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা। এখানে সেটি সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ইকরাম আলীর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ঘুষ ছাড়া কোনো কাজ না করার অভিযোগ রয়েছে। জমি ইজারা থেকে শুরু করে ফাইল প্রক্রিয়াকরণ, সব ক্ষেত্রেই অনিয়মের মাধ্যমে অর্থ আদায়ের অভিযোগে তিনি আলোচিত।

 

এ বিষয়ে নায়েব মফিজুর রহমান বলেন, ওই জমিটি ভিপি খতিয়ানভুক্ত হওয়ার সুযোগই ছিল না। আগের দায়িত্বপ্রাপ্তরা কীভাবে এটি করেছেন, তা জানা নেই। তদন্ত চলাকালে ইজারা স্থগিত থাকার কথা। কিন্তু ডিসিআর কীভাবে ইস্যু হলো, তা স্পষ্ট নয়।

 

অভিযুক্ত ইকরাম আলী দাবি করেন, এসিল্যান্ড স্যারের স্বাক্ষর থাকায় ডিসিআর দেওয়া হয়েছে। তদন্ত রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত নতুন করে ইজারা দেওয়া হবে না। তবে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন। উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) অশীষ কুমার বসুর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। মামলাধীন জমিতে তদন্ত চলাকালে ইজারা দেওয়ার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। প্রশাসনের ভেতর থেকেই যদি আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে, তাহলে সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার কতটা নিশ্চিত, এ প্রশ্ন এখন জোরালো হয়ে উঠেছে।

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর পড়ুন
এক ক্লিকে বিভাগের খবর