একাত্তরে বুদ্ধিজীবী হত্যা ও গণহত্যার অভিযোগে টাঙ্গাইলের গোপালপুরে দুই যুদ্ধাপরাধীকে গ্রেফতার করা করেছে। গ্রেফতারকৃতরা হলেন, উপজেলার ঝাওয়াইল ইউনিয়নের বেড়াডাকুরি গ্রামের মৃত সবুর মাস্টারের ছেলে মনিরুজ্জামান কোহিনূর এবং চাতুটিয়া গ্রামের মৃত শফি উদ্দীনের ছেলে আলমগীর হোসেন তালুকদার। বৃহস্পতিবার গোপালপুর থেকে আলমগীর হোসেনকে এবং নারায়নগঞ্জ থেকে মনিরুজ্জামান কোহিনূরকে গ্রেফতার করে সংশ্লিষ্ট্য থানার পুলিশ।
এর আগে তাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইনাল থেকে তাদের নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়।
এদিকে এই দুই যুদ্ধাপরাধীকে গ্রেফতারের খবরে গোপালপুর উপজেলায় স্বস্তির নিশ্বাস ফিরে আসে। শুক্রবার রাতে তাদের ফাঁসির দাবিতে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের উদ্যোগে গোপালপুর পৌরশহরে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিল শেষে থানা ব্রিজ চত্বরে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে বক্তরা তাদের ফাঁসির দাবি জানান।
জানা যায়, কোহিনুর গোপালপুর উপজেলার বেড়াডাকুরি গ্রামের মৃত সবুর মাস্টারের পুত্র। একাত্তরে রাজাকার কমান্ডার কোহিনূর ঝাওয়াইল ইউনিয়ন আওয়ামীলীগ সম্পাদক এবং সুরেন্দ্রবালা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোসলেম উদ্দীনকে ধরে নিয়ে হত্যা করেন। পরিবার শহীদ মোসলেমের লাশ ফেরত পায়নি। ১৯৯৭ সালে সরকার শহীদ বুদ্ধিজীবির তালিকায় মোসলেম উদ্দীনের নামে ২ টাকার স্মারক ডাকটিকেট প্রকাশ করেন।
একাত্তরের ডিসেম্বরে টাঙ্গাইল হানাদারমুক্ত হওয়ার আগের দিন খান সেনাদের সাথেই কোহিনুর ঢাকা গমন করেন। ১৬ ডিসেম্বর রমনা রেসকোর্স ময়দানে ৯৩ হাজার পাকিস্তানী বাহিনীর সাথে আত্মসমর্পন করেন। টানা দুই বছর ভারতের জব্বলপুর কারাগারে পাকি বাহিনীর সাথে বন্দী ছিলেন। মুক্তি পেয়ে পাকিদের সাথেই পাকিস্তানে চলে যান।
আশির দশকে কোহিনুর পাকিস্তানী নাগরিক হিসাবে জাপান যান। নব্বয়ের দশকের শেষ দিকে জাপান থেকে আসেন বাংলাদেশে। শিল্পপতি হিসাবে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনের সাথেও তিনি জড়িত ছিলেন। যুদ্ধাপরাধ ট্রাইবুনাল চলমান মামলায় গোপালপুরের মাহমুদপুর গণহত্যার সাথেও কোহিনুর জড়িত ছিলেন বলে উল্লেখ করেছেন। এ গণহত্যার সাথে জড়িত অভিযোগে গোপালপুর পৌরশহরের সূতি দাখিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আলমগীর হোসেনকেও পুলিশ গ্রেফতার করেছে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার পারভেজ মল্লিক বলেন, তাদের বিরুদ্ধে বুদ্ধিজীবী মসলিম উদ্দীনকে গুম এবং মাহমুদপুরে গণহত্যার অভিযোগ রয়েছে। পরে দীর্ঘ তদন্ত শেষে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইনাল থেকে তাদের নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। পরে তাদেরকে গ্রেফতার করা হয়।
মামলার বিবরণে বলা হয়, গ্রেফতার হওয়া দুই জনই একাত্তর সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী এবং রাজাকার হিসাবে কর্মরত ছিলেন। একাত্তর সালের ৩০ জুন মনিরুজ্জামান কোহিনূর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে ঝাওয়াইল বাজারে হামলা চালান এবং ঝাওয়াইল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সম্পাদক, সুরেন্দ্রবালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও বিশিষ্ট লেখক মসলিম উদ্দীনকে আটক করে গোপালপুর ক্যাম্পে নিয়ে আসেন। সেখানে তাকে টানা এক সপ্তাহ অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। তারপর তাকে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে লাশ গুম করা হয়। তার পরিবার মসলিম উদ্দীনের লাশের কোনো সন্ধান পায়নি।