শনিবার , ৭ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ২৪শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ - শীতকাল || ১৯শে শাবান, ১৪৪৭ হিজরি

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী অরুনা সাহার স্মৃতি চারণ

প্রকাশিত হয়েছে- বুধবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০২১

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী জেলার গৌরনদী উপজেলার আশোকাঠী গ্রামের জমিদার মোহন লাল সাহার পুত্র মানিক লাল সাহার স্ত্রী অরুনা সাহার স্মৃতি চারণ করেছেন তার জেষ্ঠ মেয়ে আইভি সাহা।

মায়ের মুখে শোনা (সদ্য প্রয়াত অরুনা সাহা) সেই দুঃসহ দিনের স্মৃতি আজো তার সন্তানদের তাড়া করে ফেরে। আইভি সাহা বলেন, আমার মা অরুণা সাহা ১৯৭১ সালে ফরিদপুর রাজেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী থাকাবস্থায় খুলনা বেতারের নিয়মিত কন্ঠ শিল্পী ছিলেন। পরে তিনি ঢাকা বেতারেও গান পরিবেশন করেছেন। পাশাপাশি তিনি জেলা শিল্পকলা একাডেমীর প্রশি¶ক হিসেবে কর্মরত থেকে একক সংগীতানুষ্ঠানসহ অনেক মঞ্চে গান পরিবেশন করেছেন।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা আসার পর চারিদিকে যখন যুদ্ধের ডামাডোল বাজছে তখন ফরিদপুর শহরেও ১৪৪ ধারা জারি করে শহরজুড়ে কারফিউ চলছিল। পাক হানাদার বাহিনী তখন সমস্ত শহর ঘিরে মহড়া দিতে থাকে এবং পুরো সার্কিট হাউস তাদের দখলে নিয়ে নেয়। উত্তপ্ত শহর! ফরিদপুর শহরে জনশূন্য রাস্তাঘাট। শহর ছেড়ে প্রাণ ভয়ে পাল্লাচ্ছে নিরস্ত্র নিরিহ মানুষ। ঠিক তখনই অন্যান্য শিল্পীদের সাথে মাকেও দেশের গান গাইতে হয়েছে মঞ্চ অনুষ্ঠানে। এরইমধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পরই সকল কন্ঠ শিল্পীদের একটা তালিকা তৈরী করে নেয় পাক সেনারা। ঘোষণা করা হয় শিল্পীদের দেখা মাত্রই গুলি করে হত্যা করার।

সেই সময়ে মা অরুনা সাহার ডাক আসে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যাবার জন্য। আমার মা অরুনা সাহা পারিবারিক সিদ্ধান্তে যোগদান করেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী হিসেবে। সাথে ছিলেন আমার ছোট মামা তবলা বাদক ও সংগীত শিল্পী বাচ্চু সাহা। তিনিও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী ছিলেন।

আইভি সাহা বলেন, মায়ের মুখে শুনেছি রাতের আঁধারে তারা প্রাণের মায়া ত্যাগ করে চুপি চুপি বাড়ি থেকে বেরিয়ে পরেন। অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে কিছু দূর পায়ে হেটে আবার গরুর গাড়ি চড়ে নানান বিকল্প পন্থায় পথ ধরে কলকাতায় পৌঁছে ছিলেন। কলকাতার টালিগঞ্জ গিয়ে বাংলাদেশের সকল শিল্পীদের সাথে মা একত্রিত হন। মায়ের সাথে যারা ছিলেন তারা সেদিন সবাই গোবরা ক্যাম্পে ছিলেন।

ওই ক্যাম্পে মা অরুনা সাহার সাথে অন্যান্য শিল্পীদের মধ্যে ছিলেন, দেশবরেণ্য কালজয়ী সংগীত শিল্পী আপেল মাহমুদ, দেশবরেণ্য আরেক কালজয়ী সংগীত শিল্পী প্রয়াত আব্দুল জব্বার, শিল্পী নমিতা ঘোষ, স্বপ্না রায়, সরদার আলাউদ্দীন, মাজাহারুল ইসলাম, শহীদুল ইসলাম, শান্তি মুখার্জী, মঞ্জুর আহমেদ, দীলিপ সোম, অবিনাশ শীল, রমা ভৌমিক, বাদল রশীদ, মাধুরী আচার্য্যসহ অনেকেই।

একসাথে দীর্ঘদিন কাজ করার সুবাদে মায়ের সাথে উল্লেখিত গুনীশিল্পীদের আত্মার সম্পর্ক হয়ে যায়। শিল্পী আপেল মাহমুদ এবং আব্দুল জব্বারের সাথে আমৃত্যু আমার মায়ের ছিলো ভাই-বোনের মতো গভীর সম্পর্ক। শিল্পী নমিতা ঘোষ ছিলেন আমার মায়ের একজন শুভাকাক্সখী। মায়ের সাথে তার (নমিতা ঘোষ) সু-সম্পর্ক ছিলো। তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং শ্রদ্ধা দেখে আমরা অনেক সময় আপ্লুত হয়ে যেতাম।

আইভি সাহা আরও বলেন, মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পীদের বিভিন্ন জায়গায় কাজ করার নির্দেশ দেন। পরে ব্যারিস্টার বাদল (এমএনএ)’র নেতৃত্বে চিত্র পরিচালক দিলীপ সোমের ‘বিক্ষুব্ধ বাংলা’ গীতি আলেখ্য নিয়ে ১৪ সদস্যর একটি কালচার গ্রুপ মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ফান্ড করার উদ্দেশ্যে ভারতের বোম্বেসহ মহারাষ্ট্র, দিল্লী, গোয়া, পুনা, কানপুর এলাকায় গণসংগীত পরিবেশন করেন। এসব পরিবেশনার মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীদের জন্য তৎকালীন নগদ ১১ লাখ টাকা, কম্বল, ওষুধ সামগ্রী সংগ্রহ করে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে জমা দেয়া হয়। বোম্বে এসব অনুষ্ঠান পরিচালনা করতেন চিত্রাভিনেত্রী ওয়াহিদা রহমান, সংগীত পরিচালক হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সলিল চৌধুরী, সবিতা চৌধুরী এবং বিশিষ্ট সাংবাদিক ও যুগ্ম-সচিব সলিল ঘোষ।

প্রয়াত মায়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আইভি সাহা আরও বলেন, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের বিখ্যাত অনেক গানের মধ্যে মা যেসব গানে কণ্ঠ দিয়েছেন তার মধ্যে অন্যতম হলো-“এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা”/‘ওভাই খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি আমার দেশের মাটি’/‘জয় বাংলা বাংলার জয়’/‘হায়রে কৃষাণ তোদের শীর্ণ দেহ দেখে যেরে অশ্রু মানেনা’। এসব গান সর্বপ্রথম রেকর্ড করা হয় শুধু হারমোনিয়াম এবং তবলা দিয়ে। সেসময় অন্যকোন মিউজিক ছিলোনা। এসব গানগুলোতে প্রথম কন্ঠ হিসেবে সবার সাথে আমার মা অরুনা সাহার কন্ঠটিও দলিল হিসেবে রয়ে গেছে।

১৪ জনের কালচারাল গ্রুপের মধ্যে আমার মা অরুনা সাহা একজন ছিলেন। তারা যুদ্ধ চলাকালীন দীর্ঘ নয় মাস একইসাথে থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রে কালজয়ী ও বিদ্রোহের গান পরিবেশন করে ঘুমন্ত বাঙালিকে জাগ্রত করে তুলেছেন।

 

 

#চলনবিলের আলো / আপন

সম্পাদক ও প্রকাশক মোঃ রফিকুল ইসলাম রনি-০১৭১৩-৫৮২৪০৬, নির্বাহী সম্পাদক মোঃ রায়হান আলী-০১৭৫১-১৫৫৪৫৫, বার্তা সম্পাদক মোঃ সিরাজুল ইসলাম আপন-০১৭৪০-৩২১৬৮১। বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ মেছের উদ্দিন সুপার মার্কেট ভবন, হান্ডিয়াল বাজার, চাটমোহর, পাবনা থেকে প্রকাশিত। ঢাকা অফিসঃ তুষারধারা, আর/এ, সেক্টর ১১, রোড নং ০৭, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১৩৬২। বার্তা কার্যালয়ঃ অষ্টমনিষা বাজার, ভাঙ্গুড়া, পাবনা। প্রকাশক কর্তৃক সজল আর্ট প্রেস, রূপকথা গলি, পাবনা থেকে মুদ্রিত। মোবাইল নম্বর-০১৭৪৯-০২২৯২২,ই-মেইল- newscbalo@gmail.com / editorcbalo@gmail.com / www.chalonbileralo.com

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ ©2017-2025 (এটি গণপ্রজাতন্ত্রি বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত সাপ্তাহিক চলনবিলের আলো পত্রিকার অনলাইন সংস্করণ) অনলাইন নিবন্ধন আবেদনকৃত। আবেদন নম্বর- ২১৮৮।