” জীবন যুদ্ধে জয়ী ” সংগ্রাম ও লড়াই করেছেন। বৈরী সমাজ ব্যবস্থার মধ্যে নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য লড়াই করে চালিয়েছেন নিজেদের জীবন ব্যাবস্থা । সব প্রতিকূলতা জয় করে সমাজে নিজেদের অবস্থান তৈরি করে নিয়ে, নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছেন। বরিশাল জেলার বানারীপাড়া উপজেলার ৫ জয়িতার জীবন-সংগ্রাম পথচলা। আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ ২০২১ও বেগম রোকেয়া দিবসে বানারীপাড়া উপজেলায় ৫ জয়িতার জীবনী উন্মোচিত হয়েছে। গত ৯ই ডিসেম্বর সকাল ১০.০০ ঘটিকায় মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের আয়োজনে উপজেলা হল রুমে ৫ জয়িতাকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। ৫ জয়িতার সফলতার বিবরণী:-১. সফল জননী জয়িতা মোসাঃ রুমা বেগম, স্বামী মৃতঃ বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ জয়নাল আবেদীন হাওলাদার। তিনি ৫নং সলিয়াবাকপুর ইউনিয়নে জন্ম গ্রহণ করেন। তার দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। সবাই স্ব স্ব স্থানে প্রতিষ্ঠিত। বড় ছেলে আবু জাফর রিপন (পি,এ,এ)। সে বর্তমানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের উপসচিব হিসেবে স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে কর্মরত আছে। ছোট ছেলে অনার্স-মাস্টার্স সম্পন্ন করে একটি ব্যাংকে অফিসার হিসেবে কর্মরত রয়েছে। দুই মেয়ে তারাও সুশিক্ষিত ও সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শত প্রতিকূলতা ও আর্থিক অস্বচ্ছলতাকে পরাজিত করে আজ তিনি সফল “জননী” জয়িতা। ২. অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারী ফিরোজা বেগম, স্বামীঃ মোঃ আলম খাঁন, ১নং ওয়ার্ড, বানারীপাড়া পৌরসভায় বসবাস করেন। তিনি তার পোস্টমাস্টার বাবার অবসরের পরে বানারীপাড়ায় একটি কাপড়ের দোকান দেন। পরবর্তীতে নিজেদের তৈরি করা আরো দুইটি দোকান ভাড়ায় দেয়া ছিল। এক পর্যায়ে দেশে মিলিটারির অত্যাচার শুরু হয়। তাদের দোকান ও বাড়ীঘর হানাদার বাহিনী আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত তার বাবা গরিব হয়ে পড়ে। জীবন যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে গরু পালনের সাথে সাথে হাঁস-মুরগী পালন শুরু করেন এবং স্বামীকে একটি খেলাধুলার পণ্য সামগ্রী বিক্রয়ের দোকান করে দেয়, পরবর্তীতে এ দোকানের আয় থেকে ৪ সন্তান লেখাপড়া করে বি.এ পাশ করে। আজ তিনি অর্থনৈতিক দিক দিয়ে স্বাবলম্বী। তিনি অসহায় নারীদের পাশে থেকে শালিসের মাধ্যমে যতটা পেরেছেন সমস্যা মিটিয়েছেন। নাগরিক উদ্যোগের তৃণমূল নারীনেত্রী নেটওয়ার্কের কমিটি নির্বাচনে এ পর্যন্ত ৩বার উপজেলা সভানেত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। ৩. নির্যাতনের বিভাষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যমে জীবন সাজিয়েছেন সফল জয়িতা নারী নাজমিন, স্বামীঃ জুয়েল তালুকদার, গ্রাম-মলুহার, বানারীপাড়া, বরিশাল। তার শশুর বাড়ির যৌতুকের দাবী তার বাবা মিটাতে পারেনি বলে তাকে অত্যাচার আর নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। তিনি ৫০০ টাকা বেতনে একটি অফিসে যোগদান করেন।পরে আস্তে আস্তে তার বেতন বাড়তে থাকে। তিনটি ছেলের মধ্যে বড় ছেলে ২০২১ সালে বিজ্ঞান বিভাগের এইচ. এস. সি পরীক্ষার্থী, মেজ ছেলে কুরআনের হাফেজ ও ছোট ছেলে নূরানী-২য় জামাত। ৪. সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান ক্যাটাগরীতে সফল জয়িতা জাকিয়া পারভীন, স্বামীঃ আঃ রহিম হাওলাদার, গ্রাম-লবনসাড়া, উপজেলা-বানারীপাড়া, জেলা-বরিশাল। তিনি ৭টি আইনের বিষয়ে মহিলাদের প্রশিক্ষণ দেন ও মহিলা সমিতি গঠন করেন। মহিলারা ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ে হাঁস-মুরগী ও গবাদি পশু পালন করে স্বাবলম্বি হওয়ার পিছনে তার রয়েছে অসামান্য অবদান। যেসকল ছেলে মেয়েরা দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণীতে পড়াশুনা করার পর আর স্কুলে যেতে পারত না তাদেরকে তিনি লবনসাড়া রশিদ চকিদারের বাড়ি পাঠ শালায় ১০:০০টা থেকে ১: ০০ টা ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত বিনা পয়সায় পড়িয়েছেন। ৫ম শ্রেণী পাস করার পর সেই সকল ঝড়ে পড়া ছেলে মেয়েরা স্কুলে যেতে পারত না তাদের তিনি বই, খাতা, কলম, জামা-কাপড় যাবতীয় খরচ বহন করতেন। তাদের মধ্যে অনেকেই এস.এস. সি পাস করে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে। বাল্য বিবাহ বন্ধে লবনসাড়া গ্রামে তার অসামান্য চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে এবং দুস্থ ছেলে মেয়েরা যাতে মাদকের সাথে জড়িয়ে না পড়ে সেজন্য তাদের বল, ব্যাটসহ খেলার প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র দিয়ে সহযোগীতা করে আসছেন তিনি। ৫. শিক্ষা ও চাকুরীর ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী নারী ক্যাটাগরীতে লাইজু, পিতা আবুল কালাম আজাদ, গ্রাম-মলুহার, বানারীপাড়া, বরিশাল। অতি অল্প বয়সে তার বিয়ে হয়ে যায়।তিনি বিয়ের পর অনেক কষ্ট করে এস.এস.সি ও এইচ. এস. সি পাস করে ঢাকায় একটি কিন্ডারগার্ডেনে চাকুরী করে। এরপরে চাকুরীর বিজ্ঞপ্তি দেখে চাকুরীর আবেদন করে বাবার সহযোগিতায় চাকুরীর ইন্টারভিউ দিলে চাকুরীটা পেয়ে যান এবং চাকুরীর সুবাদে এখন আধুনিক সচ্ছল জীবন যাপন করছেন সফল জয়ীতা লাইজু।
#চলনবিলের আলো / আপন