খাগড়াছড়ির রামগড় পাহাড়ঞ্চল কৃষিগবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড.এস এম ফয়সালের বিরুদ্ধে নিয়মিত অফিস না করা, অনিয়ম,দুর্নীতি, গাছ কাটা,স্বেচ্চাচারিতা, সংবাদ সংগ্রহকালে সাংবাদিকদের হেনস্তা সহ বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে গিয়ে জানা যায়,রামগড় পাহাড়ঞ্চল কৃষিগবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এস এম ফয়সাল ৭-৮ মাস পূর্বে রামগড় গবেষণা কেন্দ্রে যোগদান করে।যোগদান করার পর থেকই তার বিরুদ্ধে নানারকম অভিযোগ উঠেছে।কর্মস্থলে যোগদানের পর থেকেই অফিসে চাকুরিত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মাঝে গ্রুপিং সৃষ্টি এবং সরকারি ভিআইপি গেস্টহাউস নিয়মিত ব্যবহারের মাধ্যমেই তার অনিয়মের সূচনা হয়।
জানা যায়,তার অনিয়মের বিরুদ্ধে কেউ কথা না বলতে কৌশলে কর্মকর্তা ও শ্রমিকদের মাঝে দন্ধ ও মতপার্থক্যে সৃষ্টি করে রাখেন।অফিস সূত্রে জানা যায়,রামগড় কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে ৩৭টি মৌসুমী শ্রমিকদের পদ খালি রয়েছে।কর্মরত শ্রমিকদের আত্মীয় স্বজনকে ঐসকল শূণ্যপদে নিয়োগ দেয়ার কথা বলে তাদের নিয়ন্ত্রন করেন তিনি। এবং যারা তার অনিয়মতান্ত্রিক কর্মকান্ডের বিরুদ্বে কথা বলে তাদের তার নিয়ন্ত্রিত শ্রমিকদের দিয়ে হয়রানির অভিযোগ এসেছে।
তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে ব্যক্তিগত আক্রোশের জের ধরে কেন্দ্রের নিয়মিত শ্রমিক মোহাম্মদ শফিকুল ইসলামকে অব্যাহতি দিয়েছেন।এবিষয়ে জানতে চাওয়া হলে শফিকুল ইসলাম বলেন,গাছ কাটার সময় আমি ছুটিতে ছিলাম।তবুও আমার বিরুদ্ধে তিনি অভিযোগ দায়ের করেন।অভিযোগ পত্রে আমার সাথে আরো ৪জনের নাম ছিলো।কিন্তুু ব্যক্তিগত আক্রোশের জের ধরে শুধু মাত্র আমাকে কোন তথ্য প্রমাণ ছাড়া অব্যাহতি দিয়েছেন।আমি গরিব মানুষ।চাকুরি না থাকায় রমজান মাস এবং পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করেছি।
কেন্দ্র প্রধান এস এম ফয়সালের বিরুদ্ধে নিয়মিত কর্মস্থলে উপস্থিত না থাকার অভিযোগ রয়েছে। উর্ধ্বোতন কতৃপক্ষের অনুমতি ব্যতীত কেন্দ্র ত্যাগ করার কোন নিয়ম নেই।অভিযোগ রয়েছে প্রতি সপ্তাহে বৃহস্পতিবার দুপুরের পর তিনি কর্মস্থল ত্যাগ করেন এবং রবিবার বিকেলে কিংবা সোমবার কর্মস্থলে ফিরেন।
গবেষণা কেন্দ্রের ভিআইপি গেস্টহাউস দখল করে রেখেছেন তিনি।তার জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি কোয়ার্টারে না থেকে গবেষণা কেন্দ্রের ভিআইপি গেস্ট হাউস দখল করে সেটি ব্যবহার করছেন।নিয়মতান্ত্রিক ভাবে গেস্টহাউজ বুকিং দিতে কেউ আগ্রহ প্রকাশ গেস্ট হাউজ খালি নেই বলে তালা দিয়ে রাখেন।এতে করে প্রতিষ্টানটি গেস্টহাউজের নিয়মতান্ত্রিক আয় থেকে বঞ্চিত থাকে।
এছাড়াও এস এম ফয়সালের বিরুদ্ধে সরকারি গাড়ি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার এবং গবেষণাকেন্দ্রের শ্রমিক রুহুল আমিনকে বাসার কাজ করানোর অভিযোগ রয়েছে। নিয়ম রয়েছে, সরকারি কাজ ছাড়া উপজেলার বাইরে গাড়ি নিয়ে যেতে হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ও যথাযথ কারণ থাকতে হবে। অথচ তিনি প্রতিনিয়ত সরকারি গাড়ি তার চট্টগ্রামের বাসায় নিয়ে যান। বাসা চট্টগ্রাম শহরে হওয়ায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজর এড়িয়ে সরকারি গাড়িটি বেশিরভাগ সময় ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারে সুযোগ পেয়ে থাকেন তিনি। এতে জ্বলানি তেল বেশি যাচ্ছে। যা সরকারি কোষাগার থেকে মেটানো হচ্ছে। পাশাপাশি ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে গবেষণা কেন্দ্রের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন,নিয়ম রয়েছে গবেষণা কেন্দ্রের কেনাকাটায় ৪র্থ শ্রেণীর নিচে কর্মচারীদের ক্রয়কমিটিতে রাখা যাবেনা।কিন্তুু গতই ডিসেম্বর বিজয় দিবস উদযাপন উপলক্ষে ক্রয় কমিটিতে শ্রমিক অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।তিনি অভিযোগ করে আরো বলেন,ক্রয় কমিটির সভাপতি কেন্দ্রের আরেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড:মো:আব্দুস সালামকে কেনা কাটায় না নিয়ে তাকে দিয়ে স্বাক্ষর করিয়ে ভাউচার এডজাস্ট করিয়ে নেন বর্তমান কেন্দ্র প্রধান। তার বিনিময়ে ড:মো:আব্দুস সালামকে অলিখিত ছুটি এবং বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা দেয় কেন্দ্র প্রধান। ড:আব্দুস সালামকে গেস্ট হাউজে বহিরাগতদের নিয়ে মদ পানের অভিযোগে কৈফিয়ত তলব করে তাকে জিম্মি করে রেখেছেন বলেও অভিযোগ করেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই কর্মকর্তা।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধানকাজ হচ্ছে গবেষণা। গবেষণার জন্য মাঠে থাকতে হয় প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাসহ অন্যদের। কিন্তুু তা না করে প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড:ফয়সালের নেতৃত্বে অফিসে বসেই কাগজে কলমে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ এসেছে।
রামগড় পাহাড়ঞ্চল গবেষণা কেন্দ্রে গবেষণার অজুহাতে শতবর্ষী মাতৃগাছ কেটে ফেলা হচ্ছে এমন অভিযোগের ভিত্তিতে সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে স্থানীয় সাংবাদ কর্মী মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামকে পুলিশ দিয়ে হেনস্তা এবং হয়রানির অভিযোগ উঠেছে।এ বিষয়ে জানতে সংবাদকর্মী সাইফুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন,শতবর্ষী মাতৃগাছ কেটে ফেলা হচ্ছে এমন অভিযোগ পেয়ে সত্যতা জানতে প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড:এস এম ফয়সালকে মোবাইলে ফোন দেয়ায় তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে পুলিশ দিয়ে হয়রানির চেষ্টা করেছিলেন। পরে পুলিশকে বিষয়টি বুঝিয়ে বলায় পুলিশের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করেন বলে জানান তিনি। গবেষণা কেন্দ্রে কর্মরত শ্রমিকদের সংবাদকর্মী সাইফুলের মালিকানাধীন ঔষুধের দোকান থেকে কোন প্রকার ঔষুধ কিনতে নিষেধ করেন প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা।এবং তাকে দেখা নেয়ার দম্ভোক্তি প্রকাশ করেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
জানা যায়,পাহাড়তলী গবেষণা কেন্দ্র ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত থাকাকালীন সহকর্মীদের মানসিক ভাবে হয়রানির অভিযোগে তাকে দ্বিতীয় বারের মত আঞ্চলিক গবেষণা কেন্দ্র হাটহাজারিতে বদলি করা হয়।
পাহাড়তলীতে কর্মরত থাকা অবস্থায় তার মানসিক হয়রানির স্বীকার হৈমন্তী বড়ুয়া(এসও)এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন,চিৎকার চেঁচামেচি করে মানুষকে জিম্মি করে নানাবিধ সুবিধা আদায় করে নেন তিনি।পাহাড়তলী কর্মরত থাকাকালীন এসএম ফয়সাল সব সময় তার বিরুদ্ধে লেগে থাকতেন।কর্মস্থলের স্বাভাবিক পরিবেশে বিঘ্ন ঘটাতেন তিনি।
গাছ কাটার বিষয়ে জানতে চাইলে অফিস সহকারী সুনীল দাস জানিয়েছেন গাছ কাঁটার লিখিত কোন অনুমতি তাদের কাছে নেই। সরকারি অনুমতি ছাড়া কি ভাবে এ সম্পদ কাঁটা হয়েছে এমন প্রশ্নের উত্তর তিনি এড়িয়ে গেছেন।
সহকর্মী আর সাংবাদিক হেনস্তা করেই শুধু থেমে নেই তিনি।স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সাথে ও রয়েছে তার তীব্র দন্ধ।রামগড় পাহাড়ঞ্চল কৃষি গবেষণা কেন্দ্রটি রামগড় পৌরসভার ৩নং ও ৪নং ওয়ার্ডের মাঝে অবস্থিত।
৩নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর বিষ্ণু দত্ত বলেন,রামগড় পাহাড়ঞ্চল কৃষি গবেষণা কেন্দ্রটির একাংশ তার নির্বাচনী এলাকার মাঝে পড়ে।কেন্দ্রে পরিচিত অনেকে চাকুরি করে।প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা কতৃক তারা বিভিন্ন ভাবে হয়রানি হচ্ছে এমন অভিযোগ পান।অভিযোগ পেয়ে এস এম ফয়সালের কাছে জানতে চাইলে তিনি তার সাথে খারাপ ব্যবহার করেন বলে জানান।
রামগড় পৌরসভার প্যানেল মেয়র ও ৪নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আহসান উল্লাহ জানান,চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে জেলা উন্নয়ন সমন্বয় সভায় কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তুলেন রামগড় উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বিশ্বপ্রদীপ ত্রিপুরা।ঐ বৈঠকে রামগড় পাহাড়ঞ্চল গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এস এম ফয়সাল উপস্থিত ছিলেন না। রামগড় পৌরসভার প্রতিনিধি হয়ে কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের প্রতিনিধি ড:আব্দুস সালামকে শতবর্ষী গাছ কাটার কারণ সম্পর্ক জানতে চাইলে তিনি কোন সদুত্তর দিতে পারেননি।
রামগড় উপজেলা পরিষদের ভাইসচেয়ারম্যান আনোয়ার ফারুক বলেন,তিনি রামগড়ে আসার পর থেকেই স্থানীয় এলাকাবাসী এবং জনপ্রতিনিধিদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচারণ করে যাচ্ছেন।অনেক প্রকৃত কৃষকদের বাদ দিয়ে বাইরের দোকানদার দের নিয়ে কৃষক প্রশিক্ষণ কর্মশালা করেছেন বলে কয়েকজন কৃষক জানিয়েছেন।
রামগড় উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বিশ্ব প্রদীপ ত্রিপুরা জানান,অবৈধ ভাবে সরকারি ভিআইপি গেস্টহাউজটি প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা দখল করে রেখেছেন।বাইরে থেকে সরকারি উচ্চপদস্থ কোন অফিসার আসলে সিট খালি নেই বলে গেস্টহাউস তালাবদ্ধ করে রাখেন।গবেষণা কেন্দ্রে নানারকম অনিয়ম হচ্ছে শুনেছিলাম।পরে এ বিষয়ে আমরা নিশ্চিত হয়ে গত জেলা উন্নয়ন সমন্বয় সভায় উপস্থাপন করেছি।
অভিযোগের ব্যাপারে জানতে অভিযুক্ত রামগড় পাহাড়ঞ্চল গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড:এস এম ফয়সালের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগ গুলো নিয়ে কথা বলতে অস্বীকৃতি প্রকাশ করেন।এবং বলেন পত্রিকার সম্পাদকের লিখিত আবেদন নিয়ে আসলেই তিনি কথা বলবেন।
আঞ্চলিক গবেষণা কেন্দ্র হাটহাজারি শাখার মূখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা খলিলুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন,রামগড় শাখার বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এস এম ফয়সাল এক সময়ে তার নিয়ন্ত্রনে কাজ করতেন।তার বিরুদ্বে খামখেয়ালি,অনিয়ম,স্বেচ্ছাচারিতা
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) মহাপরিচালক ড:মো:নাজিরুল ইসলামকে এসব অভিযোগের বিষয়ে জানানো হলে তিনি জানান,এসব অভিযোগ এবং অনিয়মের কথা তিনি শুনেছেন।পাহাড়ঞ্চল বিধায় অনেকে যেতে চায়না।যার ফলে তাকে সরিয়ে নতুন কাউকে সেখানে পাঠানো যাচ্ছেনা।এবং তার অনিয়মের বিরুদ্ধে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন সাপেক্ষে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে।
#চলনবিলের আলো / আপন