বাংলাদেশের এক ছোট শহরে থাকতেন এক অদ্ভুত মানুষ—নাম তাঁর মুসি। বয়স প্রায় ষাট, চুল এলোমেলো, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, শার্টের পকেটে তার আর ছোট ছোট সার্কিট বোর্ড। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতো অগোছালো এক বৃদ্ধ, কিন্তু ভেতরে তিনি ছিলেন আগুনের মতো জ্বলন্ত এক মেধা।
তিনি ছিলেন একজন বিজ্ঞানী। সারাদিন-রাত গবেষণাগারে পড়ে থাকতেন। তাঁর স্বপ্ন—একটি আধুনিক ড্রোন তৈরি করা, যা দুর্যোগের সময় ওষুধ পৌঁছে দেবে, পাহাড়-নদী পেরিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াবে।
কিন্তু সাফল্য এত সহজে আসে না।
দুইবার ড্রোনটি আকাশে উঠেই মাটিতে আছড়ে পড়ে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।
সহকারী বলল,
— “স্যার, আজ থাক, কাল আবার চেষ্টা করবেন।”
মুসি চশমা খুলে মুছলেন, মৃদু হাসলেন,
— “বিজ্ঞান কখনও ‘কাল’ বলে না, সে শুধু বলে—আবার চেষ্টা করো।”
এভাবে টানা তিন দিন তিনি বাড়ি ফেরেননি। স্ত্রী-সন্তান অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত। তৃতীয় দিনের রাতে, ঠিক ১২টার দিকে তিনি হঠাৎ মনে করলেন—আজ তো বাড়ি যাওয়া উচিত!
গবেষণাগার থেকে বের হয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে একটি রিকশা ডাকলেন।
রিকশাওয়ালা জিজ্ঞেস করল,
— “কোথায় যাবেন?”
মুসি একটু ভেবে পকেট থেকে দুটো কার্ড বের করলেন। একটি কার্ড দেখিয়ে ইশারায় বললেন,
— “এখানে।”
রিকশাওয়ালা মনে মনে হাসল।
“এই লোকরে তো আগেও দুইবার বাসায় দিছি। ঠিকানা তো মুখস্থ হওয়ার কথা! তবুও কার্ড দেখায় কেন?”
দুষ্টুমি করে সে ভাবল—“এইবার অন্য রোডে নিয়ে যাই, দেখি কি করে!”
বাসার একটু আগেই রিকশা ঘুরিয়ে অন্য এক বাড়ির সামনে নামিয়ে দিল।
মুসি নেমে গেটের দিকে যেতেই দারোয়ান চিৎকার করে উঠল,
— “এই! কোথায় যান?”
হৈ-হুল্লোড় পড়ে গেল। বাড়ির লোকজন বের হয়ে এলো। একজন ভদ্রলোক ভালো করে তাকিয়ে বললেন,
— “আরে! এইটা তো আমাদের মুসি আংকেল!”
সবাই অবাক।
কারণ, এই অগোছালো মানুষটাই তো দেশের গর্ব!
তিনি সেই বিজ্ঞানী, যিনি প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পূর্ণ রোবট আবিষ্কার করেছিলেন—যা গর্ভবতী মায়েদের নিরাপদ নরমাল ডেলিভারি নিশ্চিত করে সিজারিয়ান অপারেশনের প্রয়োজন অনেকাংশে কমিয়ে দিয়েছে।
রিকশাওয়ালা পাশেই দাঁড়িয়ে সব শুনছিল। তার চোখ বড় বড় হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল—সে যাকে নিয়ে মজা করছিল, তিনি আসলে দেশের জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দেওয়া এক মহান মানুষ।
এইবার সে লজ্জিত গলায় বলল,
— “স্যার, ভুল হইছে। চলেন, আপনার আসল বাসায় নিয়ে যাই।”
আবার রিকশা চলতে শুরু করল। রাতের হালকা বাতাস বইছে। রিকশাওয়ালা ধীরে ধীরে বলল,
— “আপনারা দেশের জন্য এত কিছু করেন, সংসার-পরিবার ছাইড়া গবেষণা করেন… আমরা তো কিছুই করতে পারি না।”
মুসি মৃদু হেসে বললেন,
— “দেশের জন্য কাজ করা শুধু ল্যাবে বসে হয় না। আপনি মানুষকে ঠিক জায়গায় পৌঁছে দেন—এটাও তো সেবা।”
কিছুক্ষণ পর সত্যিকারের বাসার সামনে পৌঁছে গেলেন।
স্ত্রী দরজা খুলতেই চোখে পানি। সন্তান দৌড়ে এসে বাবাকে জড়িয়ে ধরল।
রিকশাওয়ালা নেমে এসে হঠাৎ মুসিকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরল।
— “আল্লাহ আপনাকে দীর্ঘ হায়াত দিক স্যার। দেশের অনেক দরকার আপনার মতো মানুষ।”
মুসি কিছু বললেন না। শুধু আকাশের দিকে তাকালেন। হয়তো ভাবছিলেন—ড্রোনটা আবার কাল উড়বে।
আর রিকশাওয়ালা ধীরে ধীরে চলে গেল, মুখে শুধু একটি বাক্য—
“এইরাই আসল হিরো… চুপচাপ দেশের জন্য কাজ করে যায়।”