দলিল লেখক সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ, দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য, অতিরিক্ত ফি আদায়ে নাভিশ্বাস সাধারণ মানুষের।বযশোরের অভয়নগর উপজেলার সাব-রেজিস্ট্রি অফিস যেন সেবার চেয়ে ভোগান্তির আরেক নাম। জমি ক্রয়-বিক্রয়, হেবা দলিল, বণ্টননামা, পাওয়ার অব অ্যাটর্নি কিংবা দলিল সংশোধন, প্রতিটি কাজেই অভিযোগ উঠেছে অনিয়ম, অতিরিক্ত অর্থ আদায় ও সিন্ডিকেট নির্ভর কার্যক্রমের। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সরকার নির্ধারিত ফি’র বাইরে ‘প্রসেসিং খরচ, ফাইল মুভমেন্ট, দ্রুত কাজ, ইত্যাদি নানা অজুহাতে হাজার হাজার টাকা অতিরিক্ত নেওয়া হয়। নির্ধারিত ফি ৮-১০ হাজার টাকা হলেও বাস্তবে খরচ দাঁড়ায় ১৫-২০ হাজার বা তারও বেশি।
অনেকে জানান, টাকা না দিলে দলিলে ভুল ধরিয়ে বারবার ফেরত দেওয়া হয়, ফলে বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়। অভিযোগ রয়েছে, অফিস ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী দলিল লেখক সিন্ডিকেট। নির্দিষ্ট কয়েকজনের মাধ্যম ছাড়া কাজ এগোয় না। বাইরের কোনো দলিল লেখক দিয়ে দলিল প্রস্তুত করলে নানাভাবে জটিলতা সৃষ্টি করা হয়।
অফিস চত্বরে সক্রিয় দালালরা সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে বলে, নিজে করলে মাসখানেক লাগবে, আমাদের মাধ্যমে করলে দুই দিনে হয়ে যাবে।
প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও কাঙ্ক্ষিত সেবা পান না। এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে ঘুরতে ঘুরতে দিনের শেষে হতাশ হয়ে ফিরে যান অনেকে।
কিছু ক্ষেত্রে দলিল রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হলেও সনদ বা কপি পেতে অযৌক্তিক বিলম্বের অভিযোগ রয়েছে।
নথি যাচাই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা না থাকায় অনেক সময় ভুল তথ্য বা জাল কাগজপত্র নিয়েও কাজ সম্পন্ন হওয়ার অভিযোগ শোনা যায়। এতে ভবিষ্যতে জমি নিয়ে বিরোধ ও মামলা-মোকদ্দমার ঝুঁকি বাড়ছে। সচেতন মহল বলছে, ডিজিটাল রেকর্ড ও অনলাইন যাচাই বাধ্যতামূলক করা না হলে এ ধরনের অনিয়ম কমবে না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সেবাগ্রহীতা বলেন, সরকারি ফি আলাদা, অফিসে দিতে হয় আলাদা। না দিলে কাজ আটকে থাকে। আরেকজন বলেন, প্রতিটি ধাপে ‘চা-নাস্তা’ খরচ দিতে হয়। না দিলে ফাইল নড়ে না। স্থানীয়দের প্রশ্ন, দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের অভিযোগ থাকলেও কার্যকর নজরদারি বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কেন দেখা যাচ্ছে না? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত পরিদর্শন ও গোপন তদন্ত না থাকায় দুর্নীতির সাহস আরও বাড়ছে বলে মনে করছেন অনেকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনলাইন আবেদন ও ফি পরিশোধ ব্যবস্থা চালু নির্ধারিত ফি তালিকা দৃশ্যমান স্থানে টানানো সিসিটিভি মনিটরিং জোরদার দালালমুক্ত অফিস ঘোষণা অভিযোগ বক্স ও হটলাইন কার্যকর করা এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন হলে অনিয়ম অনেকাংশে কমে আসবে। অভয়নগরের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস হোক স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক। জমি সংক্রান্ত সেবা পেতে যেন আর অতিরিক্ত অর্থ, সময় ও মানসিক হয়রানির শিকার হতে না হয়, এটাই এখন সময়ের দাবি। জরুরি ভাবে অভয়নগর উপজেলা সাব রেজিস্ট্রার ও দলিল লেখকদের অনিয়ম দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে দুর্নীতি দমন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের পদক্ষেপ কামনা করেছেন সচেতন মহল। এব্যাপারে অভয়নগর উপজেলা সাব রেজিস্ট্রারের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তাকে পাওয়া যায়নি। ফলে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।