শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম আছে, শিক্ষার্থী আছে, শিক্ষকও আছেন কিন্তু নেই নিরাপদ শ্রেণিকক্ষ। ঝুঁকিপূর্ণ ভবন আর খোলা আকাশের নিচে চলছে পাঠদান। যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা মাথায় নিয়েই স্কুলে আসছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। এমনই করুণ বাস্তবতার মুখোমুখি পাবনার চাটমোহর উপজেলার হান্ডিয়াল ইউনিয়নের নবীন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২৩১ জন শিক্ষার্থী।
বিদ্যালয়টির পুরোনো ভবনের পিলারে বড় বড় ফাটল, দেয়াল ও ছাদ থেকে খসে পড়ছে পলেস্তারা ও ইট-সিমেন্টের অংশ। প্রায় দশ বছর আগে ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হলেও আজও নির্মাণ হয়নি নতুন ভবন। ফলে কখনো জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শ্রেণিকক্ষে, আবার কখনো খোলা মাঠে বেঞ্চ পেতে ক্লাস করতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।
সরেজমিনে দেখা যায়, শীত, গরম, কুয়াশা কিংবা বর্ষা সব মৌসুমেই চরম ভোগান্তিতে পড়ছে শিশুরা। আবহাওয়া সামান্য প্রতিকূল হলেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে পাঠদান। এতে নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, বাড়ছে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার আশঙ্কা।
প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা গেছে, ব্রিটিশ শাসনামলে ১৯৪৪ সালে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৪৭ সালে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। ১৯৯২ সালে তিন কক্ষবিশিষ্ট একটি পাকা ভবন এবং ২০১০ সালে দুই কক্ষের আরেকটি ভবন নির্মাণ করা হলেও দীর্ঘদিন সংস্কার না করায় বর্তমানে দুটি ভবনই চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। সাম্প্রতিক ভূমিকম্পে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। বিদ্যালয়টিতে শিশু শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত মোট ২৩১ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে পাঠদানে নিয়োজিত রয়েছেন মাত্র পাঁচজন শিক্ষক। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই নিয়মিত পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষকরা। তবে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে তারা শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
নিরাপত্তাহীন পরিবেশ দেখে অনেক অভিভাবক সন্তানদের অন্য বিদ্যালয়ে স্থানান্তর করছেন। এতে প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার সরকারি লক্ষ্য ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ঝরে পড়ার হার বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী সুমাইয়া আফরিন বলেন, আমরা ক্লাসে বসলে ভয় লাগে। ছাদ থেকে কিছু পড়ে যাবে মনে হয়। বৃষ্টি হলে বই-খাতা ভিজে যায় তখন আর পড়তে পারি না।
পঞ্চম শ্রেণির আরেক শিক্ষার্থী জহুরুল ইসলাম জানায়, অনেক সময় মাঠে বসে ক্লাস করি। রোদে খুব গরম লাগে, শীতে খুব কষ্ট হয়।
আব্দুল লতিফ নামের এক অভিভাবক বলেন, প্রতিদিন সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে ভয় লাগে। যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, এর দায় কে নেবে? দ্রুত নতুন ভবন না হলে আমরা বাধ্য হয়ে সন্তানকে অন্য স্কুলে সরিয়ে নেব।
আরেক অভিভাবক নার্গিস পারভীন জানান, শিক্ষা চাই কিন্তু জীবনের ঝুঁকি দিয়ে নয়। সরকারের কাছে আমাদের একটাই দাবি দ্রুত নিরাপদ ভবনের ব্যবস্থা করা হোক।
শিক্ষকরা জানান, প্রতিদিন ক্লাস নেওয়ার সময় আতঙ্কে থাকতে হয়। কখন কোন দিক থেকে ইট পড়ে যায়, সেই ভয় কাজ করে। বিশেষ করে ভূমিকম্পের পর ভবনের অবস্থা আরও ভয়াবহ হয়েছে। এছাড়াও খোলা মাঠে ক্লাস নিলে শিশুরা মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না। রোদ, কুয়াশা বা বৃষ্টি হলেই পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। এতে শিক্ষার মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো: আব্দুল হাই সিদ্দিক বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই আমরা চরম ঝুঁকির মধ্যে পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছি। ভবনটি বহু আগেই পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। ছাদ ও দেয়াল থেকে প্রায়ই ইট-সিমেন্ট খসে পড়ে। শিশুদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে ক্লাস বন্ধ করতে পারছি না, আবার চালু রাখতেও ভয় হচ্ছে। একাধিকবার সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিতভাবে জানানো হলেও আজ পর্যন্ত কার্যকর কোনো সমাধান হয়নি। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে যেকোনো সময় ঘটে যেতে পারে অপূরণীয় দুর্ঘটনা।
এ বিষয়ে চাটমোহর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল গণি বলেন, বিদ্যালয়টির অবস্থা পরিদর্শন করা হয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুসা নাসের চৌধরী জানান, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।