পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার ছোট বিশাকোল উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ ও এমপিওভুক্তিকে কেন্দ্র করে অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত ব্যক্তি রাজনৈতিক প্রভাব, ভয়ভীতি ও প্রশাসনিক চাপ প্রয়োগ করে অবৈধভাবে নিয়োগ ও এমপিওভুক্ত হয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ সংক্রান্ত একটি লিখিত অভিযোগ পাবনা জেলা প্রশাসক বরাবর দিয়েছেন মোঃ সেলিম উদ্দিন নামে এক ব্যক্তি।
অভিযোগে বলা হয়েছে, পাবনা-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মকবুল হোসেনের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় এবং তার পুত্রের রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে লালিত মোঃ মাসুদ রানা ন্যূনতম যোগ্যতা ও বিধি-বিধান উপেক্ষা করে মাদ্রাসা অভিজ্ঞতা দেখিয়ে ছোট বিশাকোল উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ গ্রহণ করেন। তিনি দীর্ঘদিন সাবেক মেয়র ও উপজেলা চেয়ারম্যান ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রাসেলের প্রেস সচিব এবং ভাঙ্গুড়া প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। উক্ত নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নিয়োগবিধি, শিক্ষা প্রশাসনের নীতিমালা ও রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন করা হয়েছে। নিয়োগের পর এমপিওভুক্তির ফাইল প্রেরণে সংশ্লিষ্ট দপ্তর আপত্তি জানালেও অদৃশ্য ও অনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এমপিওভুক্ত হতে সক্ষম হন তিনি। বিষয়টিকে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সুস্পষ্ট দৃষ্টান্ত।
অভিযোগে আরোও বলা হয়েছে, এমপিওভুক্ত শিক্ষক হিসেবে নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত থেকে দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে তিনি অধিকাংশ সময় সাংবাদিকতা পেশায় ব্যস্ত থাকেন। নিয়মিত অনুপস্থিতির কারণে পাঠদান কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এবং শিক্ষার্থীরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সাংবাদিক পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি অফিস ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে অবৈধ অর্থ দাবি করা। দাবি পূরণ না হলে তার নিজস্ব ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট মাধ্যমে মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ প্রকাশ করে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন ও হয়রানি করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যেই উপজেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রকাশ্যে প্রতিবাদ জানাতে শুরু করেছেন। স্থানীয়দের মতে, দীর্ঘদিন ধরে চলা এসব অপকর্মের বিরুদ্ধে এখন জনমত তৈরি হচ্ছে।
সম্প্রতি সংবাদ প্রকাশ করে হয়রানির অভিযোগে পাবনা জেলা জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি মামলা দায়ের হয়েছে তার বিরুদ্ধে। চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি দায়ের হওয়া মামলাটি সংশ্লিষ্ট আদালত তদন্তের জন্য ভাঙ্গুড়া থানা পুলিশকে আদেশ দিয়েছেন।
শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের দাবি, এসব অনিয়ম ও দায়িত্বহীনতার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিদ্যালয়ের ফলাফলে। ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় ছোট বিশাকোল উচ্চ বিদ্যালয় উপজেলাজুড়ে সর্বনিম্ন ফলাফল অর্জন করে মাত্র ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয় এবং একজন শিক্ষার্থীও জিপিএ-৫ পায়নি। বিষয়টি বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ধ্বংসের কারণ বলে মনে করছেন তারা। বর্তমানে বিষয়টি নিয়ে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর পাবনা জেলা কমিটি যুগ্ম সম্পাদক সৈকত আফরোজ আসাদ বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অবৈধ নিয়োগ ও দায়িত্বে অবহেলার ঘটনা শিক্ষার পরিবেশের জন্য একটা বাজে উদাহরণ। প্রশাসন যদি এ সকল বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে স্থানীয় শিক্ষার মান আরও খারাপ হবে। আমরা আশা করি, জেলা প্রশাসন এবং শিক্ষা কর্তৃপক্ষ দ্রুততার সাথে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেবে।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত শিক্ষক মাসুদ রানার বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
ভাঙ্গুড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাপস পাল বলেন, এ বিষয়ে একজন সচেতন নাগরিক জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন। বিদ্যালয়ে শিক্ষার মান ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আমরা সকল অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেছি। তদন্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত প্রয়োজনীয় তদারকি ও পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
অভিযোগ প্রাপ্তি স্বীকার করে পাবনা জেলা প্রশাসক শাহেদ মোস্তফা বলেন, আমরা বিষয়টি যথাযথভাবে দেখছি। অভিযোগের ভিত্তিতে অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্ত শুরু করা হবে এবং যদি কোন অনিয়ম প্রমাণিত হয়, সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।