দীর্ঘ আট বছরেও জমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু না হওয়ায় বান্দরবানে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপনের প্রকল্পটি বাতিলের মুখে পড়েছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ—উপযুক্ত জমি চিহ্নিত করার পরও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা কিছু সুবিধাভোগীর অযৌক্তিক আপত্তির কারণে অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া এগোয়নি। প্রকল্পের বর্ধিত মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৫ সালের ৩০ জুন। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে এই গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি বান্দরবান থেকে হারিয়ে যেতে পারে।
২০১৮ সালে দেশের ২৩টি জেলায় পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপন প্রকল্প গ্রহণ করে সরকার। এ প্রকল্পের আওতায় বান্দরবানেও একটি ইনস্টিটিউট স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। প্রয়োজন ছিল ৫ একর জমির, যা নিরিবিলি পরিবেশে এবং শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের উপযোগী হবে।
কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, নানা চেষ্টার পর বান্দরবান-চট্টগ্রাম সড়কের মাঝেরপাড়া এলাকায় সবদিক বিবেচনায় উপযোগী একটি জায়গা চিহ্নিত করা হয়। জেলা প্রশাসনকে জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাবও দেওয়া হয়। কিন্তু প্রক্রিয়া চলার মাঝেই এক পক্ষ আপত্তি তোলে—জমিতে একজন আওয়ামী লীগের নেতার ভাইয়ের মালিকানা রয়েছে, পাশে পাহাড়ি পাড়া রয়েছে, ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংঘর্ষ বা সড়ক অবরোধ হতে পারে।
তবে সরেজমিনে পরিদর্শনে দেখা গেছে, প্রস্তাবিত জমির আশপাশে কোনো পাড়া বা ঘরবাড়ি নেই। একটি পাহাড় ওই এলাকায় প্রাকৃতিক সীমারেখা তৈরি করেছে। স্থানীয় বাসিন্দা উছামং মারমা ও নাসির উদ্দিন বলেন, শুরুতে কোনো আপত্তি ছিল না। গত মার্চে বহিরাগত কিছু রাজনৈতিক কর্মী এলাকাবাসীকে প্ররোচিত করে আপত্তি তোলার ব্যবস্থা করেন। তারা চাইছেন ইনস্টিটিউটটি সুলতানপুরে তাদের জমিতে নির্মিত হোক।
তবে সুলতানপুরের প্রস্তাবিত জায়গাটি প্রধান সড়ক থেকে অনেক দূরে এবং তা তিন ফসলি জমি—যা আইনি ও বাস্তব দিক থেকে সমস্যাসংকুল। সেই জমিতে নির্মাণ ব্যয়ও অনেকগুণ বেড়ে যাবে।
যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে শিক্ষার এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পটি বান্দরবান হারাতে পারে। মিথ্যা অভিযোগ ও রাজনৈতিক প্রভাব যদি প্রকল্প ব্যাহত করে, তাহলে স্থানীয় জনগণের দীর্ঘদিনের দাবি ও স্বপ্ন নস্যাৎ হয়ে যাবে।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান উক্যনু মারমা বলেন, “মাঝেরপাড়া এলাকার জমিটি জনবসতিহীন, পাড়াসংলগ্ন নয় এবং শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের জন্য আদর্শ। আপত্তির পেছনে মূল কারণ, জমির মালিক আওয়ামী লীগ নেতার ভাই।”
প্রস্তাবিত জমির মালিক ইদ্রিছ চৌধুরী, শহীদুল আলম ও তানজিনা আফরিন বলেন, “আমরা শিক্ষক ও সরকারি চাকরিজীবী। এলাকার স্বার্থে জমি দিতে রাজি হয়েছি। এখানে ইনস্টিটিউট হলে শিক্ষার্থীদের যোগাযোগ সুবিধা থাকবে।”
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ওই এলাকায় আগে থেকেই চা-বোর্ড অফিস, রেডক্রিসেন্ট হাসপাতাল, পিটিআই, ম্যাটস, ম্রো আবাসিক স্কুল ও আনসার ব্যাটালিয়নের মত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে। তাই এই জায়গাটিই সবচেয়ে উপযুক্ত।
পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের চেয়ারম্যান কাজী মুজিবুর রহমান বলেন, “একটি গোষ্ঠী ষড়যন্ত্র করে প্রকল্পটি বানচালের চেষ্টা করছে। যদি প্রকল্পটি বাতিল হয়, নাগরিক পরিষদ আন্দোলনে নামবে।”
তবে প্রকল্প পরিচালকের কাছে পাঠানো তদন্ত প্রতিবেদনে সদর উপজেলার ইউএনও মারুফা সুলতানা উল্লেখ করেন, “পরিদর্শনকালে যেসব লোকজনের সঙ্গে কথা বলেছি, তারা প্রস্তাবিত জায়গার বিরোধিতা করেছেন এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কার কথা বলেছেন। আমি স্থানীয় মতামতের ভিত্তিতে প্রতিবেদন দিয়েছি।”
কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক কবির হোসাইন বলেন, “মাঝেরপাড়া জায়গাটি উপযোগী। উপযুক্ত জমি না পেলে বান্দরবানে পলিটেকনিক হবে না।”
জেলা শিক্ষা প্রকৌশল বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান বলেন, “পলিটেকনিক হলে স্থানীয় শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ ও কর্মসংস্থান তৈরি হবে। জমি অধিগ্রহণ শেষ হলেই টেন্ডার আহ্বান করা হবে।”
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক এসএম মনজুরুল হক জানান, “মাঝেরপাড়া এলাকার জমিটি সবার পছন্দ। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর জমিটি চূড়ান্ত করলেই অধিগ্রহণ শুরু করা হবে।