[bangla_day] , [english_date] || [bangla_date] - [bangla_season] || [hijri_date]

ইসলামের অদৃশ্য শক্তি: বিশ্বাস থেকে দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি উচ্চারণে- সাইদুজ্জামান সাগর

প্রকাশিত হয়েছে- শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬

খুব সাধারণ একটি বিষয় নিয়ে ভাবছিলাম। পৃথিবীর অধিকাংশ মুসলমানই পবিত্র কোরআন ও হাদিস সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান রাখেন না। অনেকেই ধর্মীয় বিধিবিধান যথাযথভাবে জানেন না, নিয়মিত ধর্মচর্চাও করেন না। অথচ আশ্চর্যজনকভাবে, তাঁদের বড় একটি অংশ ইসলামের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও আবেগ ধারণ করেন।

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ইসলাম ও মুসলমানদের নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণা, রাজনৈতিক বিরোধিতা কিংবা সামাজিক ভুল ধারণা ছড়িয়ে পড়লেও মুসলমানদের একটি বড় অংশের ধর্মীয় পরিচয় ও ইসলামের প্রতি আবেগ অটুট থাকে।

প্রশ্ন হলো, এর পেছনের কারণ কী? ইসলামের এমন কোন অন্তর্নিহিত শক্তি রয়েছে, যা শত প্রতিকূলতার মধ্যেও মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে রেখেছে?

আমার দৃষ্টিতে এর পেছনে কয়েকটি মৌলিক কারণ রয়েছে।

প্রথম শক্তি: আদর্শিক ও বিশ্বাসের শক্তি

ইসলামের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর সুসংহত একেশ্বরবাদী দর্শন। একজন স্রষ্টার প্রতি নিরঙ্কুশ বিশ্বাস, জবাবদিহির ধারণা, ন্যায়বিচার, মানবিকতা, সাম্য ও পরকালের প্রত্যয়—এসব বিষয় একজন মানুষের চিন্তা ও জীবনবোধকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

ইসলাম শুধু কিছু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের নাম নয়; বরং এটি মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার, সমাজ, নৈতিকতা ও মানবিক দায়িত্ববোধের সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি জীবনদর্শন।

দ্বিতীয় শক্তি: সহজ, সরল ও সর্বজনীন শিক্ষা

ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস ও ইবাদতের ধারণা সাধারণ মানুষের কাছে সহজবোধ্য। এখানে স্রষ্টার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য কোনো মধ্যস্থতাকারীর প্রয়োজন নেই। একজন মানুষ পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে সরাসরি মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে পারেন।

একত্ববাদের মূল ধারণাটিও অত্যন্ত সরল—স্রষ্টা একজন, তাঁর কোনো শরিক নেই। এই সরলতা, বিশ্বাসের স্বচ্ছতা এবং সর্বজনীনতার আবেদন ইসলামের গ্রহণযোগ্যতাকে শক্তিশালী করেছে।

তৃতীয় শক্তি: অবিরাম ধর্মীয় উপস্থিতি

পৃথিবীতে ইসলামের সূর্য কখনো অস্তমিত হয় না—এ কথাটি শুধু কাব্যিক উপমা নয়, এর পেছনে রয়েছে একটি বিস্ময়কর বাস্তবতা।

পৃথিবীর কোনো না কোনো প্রান্তে প্রতিনিয়ত আজান হচ্ছে, নামাজ আদায় হচ্ছে, কোরআন তিলাওয়াত হচ্ছে। এক অঞ্চলে যখন রাত, অন্য অঞ্চলে তখন দিন। ফলে বিশ্বের কোথাও না কোথাও মুসলমানরা আল্লাহর স্মরণে নিয়োজিত রয়েছেন।

এ যেন সময় ও ভৌগোলিক সীমানা অতিক্রম করে চলা এক অবিরাম আধ্যাত্মিক প্রবাহ।

এসব তো ইসলামের বিশ্বাস ও ধর্মীয় কাঠামোর শক্তির কথা। এবার আসা যাক আরও চমৎকার একটি বিষয়ে।

যারা ধর্ম খুব বেশি জানেন না, তাঁরাও ইসলামকে এত ভালোবাসেন কেন?

আমার কাছে এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা হলো—ইসলাম শুধু ধর্মীয় গ্রন্থের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং মুসলমানদের দৈনন্দিন ভাষা, অভ্যাস, সংস্কৃতি ও আবেগের সঙ্গে মিশে আছে।

অনেক মুসলমান হয়তো নিয়মিত ধর্মীয় অনুশীলন করেন না, কিন্তু তাঁদের প্রতিদিনের কথাবার্তা ও আচরণে ইসলামের উপস্থিতি ঠিকই থাকে।

এক. সালামের মাধ্যমে শান্তির বার্তা

একজন মুসলমান প্রতিদিন পরিচিত-অপরিচিত বহু মানুষের সঙ্গে দেখা করেন। তাঁদের অনেকেই পরস্পরকে সালাম দেন।

‘আসসালামু আলাইকুম’—এর অর্থ আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক।

অর্থাৎ একটি সাধারণ অভিবাদনের মধ্য দিয়েই একজন মানুষ অন্যজনের জন্য শান্তি ও কল্যাণ কামনা করছেন। এটি শুধু সামাজিক সৌজন্য নয়, ইসলামের একটি সুন্দর মানবিক শিক্ষারও বহিঃপ্রকাশ।

দুই. বিসমিল্লাহ দিয়ে ভালো কাজের সূচনা

শৈশব থেকেই মুসলিম শিশুদের শেখানো হয়, ভালো কোনো কাজ শুরু করার আগে ‘বিসমিল্লাহ’ বলতে।

অর্থাৎ মহান আল্লাহর নামে কাজ শুরু করা।

এই একটি শব্দের মাধ্যমে শিশুর মনে ছোটবেলা থেকেই স্রষ্টার স্মরণ, কৃতজ্ঞতা ও নির্ভরতার বীজ বপন হয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এটি অনেকের জীবনের স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিণত হয়।

তিন. সৌন্দর্য দেখলে সুবহানাল্লাহ

প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য, আকাশের বিশালতা, ফুলের রং, পাহাড়, নদী কিংবা কোনো বিস্ময়কর সৃষ্টি দেখে অনেক মুসলমান স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলে ওঠেন—’সুবহানাল্লাহ’।

অর্থাৎ মহান আল্লাহ পবিত্র ও মহিমাময়।

সৃষ্টির সৌন্দর্য দেখে স্রষ্টাকে স্মরণ করার এই অভ্যাস মানুষের মধ্যে বিস্ময়, কৃতজ্ঞতা ও আধ্যাত্মিক অনুভূতি তৈরি করে।

চার. ভালো সংবাদে আলহামদুলিল্লাহ

কোনো সুসংবাদ পেলে, বিপদ কেটে গেলে কিংবা জীবনে ভালো কিছু ঘটলে মুসলমানদের মুখে প্রায়ই শোনা যায়—’আলহামদুলিল্লাহ’।

অর্থাৎ সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহর জন্য।

এই একটি শব্দ মানুষকে মনে করিয়ে দেয়, জীবনের প্রাপ্তি শুধু নিজের যোগ্যতার ফল নয়; এর পেছনে স্রষ্টার অনুগ্রহের প্রতিও কৃতজ্ঞ থাকা প্রয়োজন।

পাঁচ. ভবিষ্যতের পরিকল্পনায় ইনশাআল্লাহ

আগামীকাল কী হবে, পরবর্তী মুহূর্তে কী ঘটবে—তা কোনো মানুষই নিশ্চিতভাবে জানেন না।

তাই ভবিষ্যতে কোনো কাজ করার কথা বলার সময় মুসলমানরা বলেন—’ইনশাআল্লাহ’।

অর্থাৎ আল্লাহ চাইলে।

এটি শুধু একটি ধর্মীয় শব্দ নয়; বরং মানুষের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করা এবং ভবিষ্যতের ওপর স্রষ্টার ইচ্ছার প্রতি আস্থা রাখার একটি প্রকাশ।

ছয়. আল্লাহু আকবার—এক বিশ্বাসের সর্বজনীন ঘোষণা

ইসলামের অন্যতম শক্তিশালী ও বহুল উচ্চারিত বাণী হলো—’আল্লাহু আকবার’।

এর অর্থ, আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ।

আজান, নামাজ, ঈদ, ধর্মীয় সমাবেশ কিংবা ব্যক্তিগত ইবাদত—বিভিন্ন উপলক্ষে এই বাণী উচ্চারিত হয়।

পৃথিবীর কোটি কোটি মুসলমান এই একই বাক্যের মাধ্যমে তাঁদের বিশ্বাস, আত্মসমর্পণ ও স্রষ্টার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করেন।

কোথাও ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি উচ্চারিত হলে পৃথিবীর অন্য প্রান্তের একজন মুসলমানও এর অর্থ ও তাৎপর্যের সঙ্গে সহজেই নিজেকে সংযুক্ত করতে পারেন।

তাহলে ইসলামের প্রকৃত ব্যবহারিক শক্তি কোথায়?

আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, ইসলাম মানুষের জীবনে শুধু বিশ্বাস হিসেবে উপস্থিত নয়; এটি ভাষা, অভ্যাস, আবেগ, সংস্কৃতি ও সামাজিক সম্পর্কের মধ্যেও প্রতিনিয়ত পুনরুজ্জীবিত হচ্ছে।

একজন মুসলমান হয়তো প্রতিদিন কোরআনের দীর্ঘ কোনো অধ্যায় পাঠ করেন না, ধর্মীয় জ্ঞানচর্চাও করেন না; কিন্তু দিনের শুরুতে বিসমিল্লাহ, কারও সঙ্গে দেখা হলে সালাম, ভালো কিছু দেখলে সুবহানাল্লাহ, সুখবর পেলে আলহামদুলিল্লাহ এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনায় ইনশাআল্লাহ—এসব শব্দের মাধ্যমে তাঁর জীবনে বারবার ইসলামের উপস্থিতি ফিরে আসে।

এখানেই রয়েছে ইসলামের এক অনন্য ব্যবহারিক শক্তি।

পৃথিবীর অনেক ধর্মীয় দর্শন মানুষের বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও ইসলামের এই বহুল ব্যবহৃত শব্দগুলো দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক কথোপকথনের অংশ হয়ে উঠেছে। ফলে ধর্মীয় অনুভূতি শুধু বিশেষ কোনো দিন বা অনুষ্ঠানের মধ্যে আটকে থাকে না; বরং প্রতিদিনের জীবনেই তার প্রকাশ ঘটে।

আমার কাছে ইসলামের প্রভাব ও স্থায়িত্বের অন্যতম বড় রহস্য এখানেই—ইসলাম শুধু মুসলমানদের উপাসনালয়ে নেই, আছে তাঁদের ভাষায়, অভিবাদনে, কৃতজ্ঞতায়, আশায়, প্রার্থনায় এবং প্রতিদিনের অসংখ্য ছোট ছোট অভ্যাসে।

এ কারণেই হয়তো ধর্মীয় জ্ঞান সীমিত হলেও অনেক মানুষের হৃদয়ে ইসলামের প্রতি ভালোবাসা এত গভীর।

কারণ, কোনো আদর্শ যখন মানুষের বিশ্বাসের পাশাপাশি তার দৈনন্দিন জীবন ও সংস্কৃতির অংশ হয়ে যায়, তখন সেই আদর্শের প্রভাব শুধু জ্ঞান দিয়ে পরিমাপ করা যায় না।

ইসলাম শুধু একটি বিশ্বাসের নাম নয়; কোটি কোটি মানুষের জীবনে এটি একটি জীবন্ত অনুভূতি, পরিচয় ও জীবনদর্শন।

সম্পাদক ও প্রকাশক মোঃ রফিকুল ইসলাম রনি-০১৭১৩-৫৮২৪০৬, নির্বাহী সম্পাদক মোঃ রায়হান আলী-০১৭৫১-১৫৫৪৫৫, বার্তা সম্পাদক মোঃ সিরাজুল ইসলাম আপন-০১৭৪০-৩২১৬৮১। বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ মেছের উদ্দিন সুপার মার্কেট ভবন, হান্ডিয়াল বাজার, চাটমোহর, পাবনা থেকে প্রকাশিত। ঢাকা অফিসঃ তুষারধারা, আর/এ, সেক্টর ১১, রোড নং ০৭, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১৩৬২। বার্তা কার্যালয়ঃ অষ্টমনিষা বাজার, ভাঙ্গুড়া, পাবনা। প্রকাশক কর্তৃক সজল আর্ট প্রেস, রূপকথা গলি, পাবনা থেকে মুদ্রিত। মোবাইল নম্বর-০১৭৪৯-০২২৯২২,ই-মেইল- newscbalo@gmail.com / editorcbalo@gmail.com / www.chalonbileralo.com

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ ©2017-2025 (এটি গণপ্রজাতন্ত্রি বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত সাপ্তাহিক চলনবিলের আলো পত্রিকার অনলাইন সংস্করণ) অনলাইন নিবন্ধন আবেদনকৃত। আবেদন নম্বর- ২১৮৮।