সিভিল সার্জন কার্যালয়ে নেই প্রতিষ্ঠানের তথ্য, লাইসেন্স যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস স্বাস্থ্য কর্মকর্তার। যশোরের অভয়নগরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে অবস্থিত রওশনারা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অনুমোদন, রোগ নির্ণয়ের সক্ষমতা ও রোগী সংগ্রহের পদ্ধতি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। সরকারি হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের বিভিন্ন প্রলোভনে বেসরকারি এই প্রতিষ্ঠানে নিয়ে গিয়ে অতিরিক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানোর অভিযোগও উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই এবং প্রতিষ্ঠানের বৈধ কাগজপত্র পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, রওশনারা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নামে যশোরের সিভিল সার্জন কার্যালয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এ অবস্থায় প্রতিষ্ঠানটির বৈধ লাইসেন্স ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন রয়েছে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিষয়টি খোঁজ নিয়ে লাইসেন্স না থাকলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় সূত্র ও অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসা কিছু রোগীকে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে রওশনারা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নেওয়া হয়। সেখানে প্রয়োজনীয়তার তুলনায় বেশি পরীক্ষা করানো কিংবা রোগীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, রোগী সংগ্রহের কাজে একটি দালালচক্র সক্রিয়। সরকারি হাসপাতালে আসা অসহায় ও অসচেতন রোগীদের লক্ষ্য করে এ ধরনের তৎপরতা চালানো হলে তাঁরা আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার ঝুঁকিতেও পড়তে পারেন। তবে অভিযোগে উল্লিখিত দালালদের পরিচয়, রোগীর সংখ্যা, পরীক্ষার মূল্য এবং আর্থিক লেনদেনের তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
রোগ নির্ণয়ের যন্ত্রপাতি ও সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন
একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নির্ভুল রোগ নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন, উপযুক্ত যন্ত্রপাতি, দক্ষ জনবল, মানসম্মত পরীক্ষাপদ্ধতি এবং যথাযথ পরিবেশ থাকা জরুরি। অভিযোগ উঠেছে, রওশনারা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আধুনিক ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির ঘাটতি রয়েছে। তবে কোন কোন যন্ত্রপাতি নেই, কী ধরনের পরীক্ষা সেখানে করা হয় এবং পরীক্ষার ফলাফলের মান কেমন, এসব বিষয়ে সরেজমিন পরিদর্শন ও সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভুল বা নিম্নমানের পরীক্ষার ফলাফলের ওপর নির্ভর করে চিকিৎসা দেওয়া হলে রোগ নির্ণয়ে বিলম্ব, ভুল চিকিৎসা এবং রোগীর অতিরিক্ত ব্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। তাই প্রতিষ্ঠানটির পরীক্ষাগার, যন্ত্রপাতি, কর্মরত জনবল ও পরীক্ষার মান যাচাই করা জরুরি।
মালিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ, বক্তব্য পাওয়া যায়নি
স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির মালিক হিসেবে পরিচিত চিকিৎসক পরাগ সেখানে রোগী দেখেন। তাঁর বিরুদ্ধে রোগী সংগ্রহের একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগও উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা নথি বা প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলো তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য রওশনারা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরিচালক চিকিৎসক পরাগের সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে। সিভিল সার্জন যশোর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, নওয়াপাড়া রওশনারা ডায়াগনস্টিক সেন্টার নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের তথ্য তাদের কাছে নেই বলে জানানো হয়েছে। তবে কার্যালয়ের নিবন্ধন বা তালিকায় তথ্য না পাওয়াই এককভাবে প্রতিষ্ঠানটির অবৈধতার চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে লাইসেন্স, নিবন্ধন, নবায়ন এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদনের নথি যাচাই করে প্রকৃত অবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদন না থাকলে কীভাবে কার্যক্রম চলছে, রোগ নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করা হয়েছে কি না এবং রোগী সংগ্রহে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী জড়িত কি না, এসব বিষয় তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল। এ বিষয়ে অভয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আলিমুর রাজিব বলেন, ওই ডায়াগনস্টিক সেন্টার সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে লাইসেন্স না থাকলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি। স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক প্রয়োজনের সঙ্গে জড়িত। তাই কোনো বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বৈধতা, পরীক্ষার মান কিংবা রোগীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় নিয়ে অভিযোগ উঠলে তা অবহেলা করার সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য বিভাগ ও প্রশাসনের উচিত দ্রুত সরেজমিন তদন্ত করে প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স, অনুমোদিত পরীক্ষার তালিকা, যন্ত্রপাতি, জনবল, মূল্যতালিকা এবং রোগী সংগ্রহের পদ্ধতি যাচাই করা। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ এবং রোগীদের স্বার্থ সুরক্ষার দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকেরা। একই সঙ্গে তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত না হলে প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য ও প্রকৃত অবস্থাও জনসমক্ষে তুলে ধরার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা। এখন প্রশ্ন হলো, রওশনারা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বৈধ কাগজপত্র ও সেবার মান যাচাই করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নেয়? রোগীদের স্বার্থে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের দিকেই তাকিয়ে রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।